বাংলাদেশে শিশুশ্রম ও আইনের শাসন: বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
অ্যাডভোকেট আকমল হোসেন:বাংলাদেশে শিশুশ্রম একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যাধি, যা অর্থনীতি, দারিদ্র্য এবং শিক্ষার অভাবে আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগের পথে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তুলছে।
শিশুশ্রমের বর্তমান চিত্র: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন শিশুশ্রমিক রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনে এই শিশুদের শ্রম দেখা গেলেও, এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
* খাতভিত্তিক চিত্র: শিশুশ্রমের প্রায় ৭০ শতাংশই দেখা যায় কৃষিক্ষেত্রে। এরপর ২০ শতাংশ সেবা খাতে এবং ১০ শতাংশ শিল্প খাতে কাজ করছে। তবে, অনানুষ্ঠানিক খাত যেমন হোটেল, গ্যারেজ, রিকশা-ভ্যান চালনা, গৃহকর্ম এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পের মতো বিপজ্জনক কাজে শিশুদের উপস্থিতি অনেক বেশি। এই সব অনানুষ্ঠানিক খাতে আইনি তদারকি প্রায় থাকেই না।
* আর্থসামাজিক কারণ: দারিদ্র্যই হলো শিশুশ্রমের মূল কারণ। একটি পরিবার যখন তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বাধ্য হয়ে শিশুদের উপার্জনের পথে ঠেলে দেয়। এছাড়া, শিক্ষার উচ্চ ব্যয়, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং প্রাপ্তবয়স্কদের বেকারত্বও শিশুদের শ্রমে নিযুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। অনেক সময় কম মজুরিতে শিশুশ্রমিক পাওয়া যায় বলে নিয়োগকারীরাও তাদের কাজে উৎসাহিত হন।
আইনের শাসন: কাঠামো ও সীমাবদ্ধতা
শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
* বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩): এই আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের যেকোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোররা ঝুঁকিমুক্ত, হালকা কাজ করতে পারে, তবে শর্ত হলো সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না।
* শিশু আইন, ২০১৩: এই আইন শিশুদের শোষণ থেকে রক্ষা করে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে।
* জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০: এই নীতিতে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এবং ২০২৫ সালের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আইন প্রণয়ন হলেও এর প্রয়োগে ব্যাপক দুর্বলতা দেখা যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মনিটরিং ও পরিদর্শন কার্যক্রম পর্যাপ্ত না হওয়ায়, অনেক ক্ষেত্রেই আইনের লঙ্ঘন হয়। বেশিরভাগ শিশুশ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে আইনি প্রয়োগ ও নজরদারি করা কঠিন। দারিদ্র্য এবং অসচেতনতাও এই সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে।
ভবিষ্যতের পথে: করণীয় ও চ্যালেঞ্জ
শিশুশ্রম নিরসনে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানেও জোর দিতে হবে। সরকারকে তাই বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হচ্ছে। যেমন:
* পারিবারিক সহায়তা: দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
* শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের উদ্ধার করে তাদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
* সচেতনতা বৃদ্ধি: অভিভাবক, নিয়োগকারী এবং সমাজের সর্বস্তরে শিশুশ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। দারিদ্র্য, সচেতনতার অভাব এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যাপকতা দূর করতে পারলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং শিশুদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সহজ হবে।








