গুমের বেদনা থেকে সংসদের সিঁড়ি: সংরক্ষিত আসনে ত্যাগের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ
রাজীব চক্রবর্তী,চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে সরকারি দল বিএনপির ভেতরে নীরব কিন্তু তীব্র আলোচনার ইঙ্গিত মিলছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, তবু সম্ভাব্য প্রার্থীরা বায়োডাটা জমা দিচ্ছেন—এটা স্পষ্ট যে প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে। প্রকাশ্য বক্তব্যের বাইরে, অন্দরে হিসাব-নিকাশ চলছে বলেই শোনা যায়। কে কতটা সক্রিয় ছিলেন, দুর্দিনে কার ভূমিকা কেমন ছিল, ব্যক্তিগত ত্যাগের গল্প কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্ন নাকি বিবেচনায় আসছে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে নির্যাতনের মুখেও সংগঠনের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মী এবং গুম হওয়া নেতাদের পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি কতটা আনুষ্ঠানিক নীতিতে রূপ নিয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। তবে এমন আলোচনা যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তা বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হচ্ছে। দলের ভেতরের অনেকে এটিকে সময়োপযোগী বলছেন—সম্ভবত ত্যাগের রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রয়াস হিসেবে। বিএনপি দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি, ফলে প্রত্যাশীর সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন নেত্রীর নাম ঘুরছে। কর্মী-সমর্থকেরা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন, ছবি শেয়ার করছেন, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নারী সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এই প্রচারণা আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করে, তা বলা কঠিন; তবু জনমত তৈরির চেষ্টা যে আছে, তা অস্বীকার করা যাবে না।
চট্টগ্রাম থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে আগ্রহী নেত্রীদের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, ফাতেমা বাদশা, মনোয়ারা বেগম মনি, জেলী চৌধুরী, মেহেরুন নেছা নার্গিস, জান্নাতুল নাঈম রিকু, নাজমা সাঈদ, জেবুন নেছা রুনা এবং সুলতানা পারভীন—প্রত্যেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা ও কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক—সব মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নানা সূক্ষ্ম সমীকরণের ওপর।
ফটিকছড়ি প্রসঙ্গে জল্পনা আরও ঘন। সুলতানা পারভীন, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের লেলাং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল আলম সিরাজের স্ত্রী, সম্ভাব্যদের মধ্যে আলোচিত নাম। শহিদুল আলম সিরাজকে স্থানীয়ভাবে ত্যাগী নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। “চলো চলে ঢাকা চলে” কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি—এমন দাবিও শোনা যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলেনি; অনেকে ধারণা করেন, তিনি গুমের শিকার হতে পারেন। তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা চূড়ান্ত সত্য এখনো অনির্দিষ্ট। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, তিনি সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। গত ১৭ বছরে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন—এমন কথাও প্রচলিত আছে। লেলাং ইউনিয়নের কিছু বাসিন্দার প্রত্যাশা, গুমের শিকার এক নেতার পরিবারকে মূল্যায়ন করা হলে তা প্রতীকী বার্তা দেবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথাবার্তার ভেতরে এই প্রতীক কতটা কার্যকর হবে, সেটি অবশ্য রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করবে।
সুলতানা পারভীনের বক্তব্যে ব্যক্তিগত বেদনার ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, দলের দুর্দিনে তাঁর স্বামী জীবনবাজি রেখে কাজ করেছেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নিয়েই নিখোঁজ হয়েছেন। স্বামীকে ছাড়া জীবন কতটা কঠিন হতে পারে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যের পক্ষে বোঝা সহজ নয়—এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, মনোনয়ন পেলে দলের আদর্শের প্রতি অনুগত থাকবেন; তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলেরই।
সব মিলিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রশ্নটি কেবল একটি সাংগঠনিক নিয়োগ নয়। এর ভেতরে রয়েছে ত্যাগের রাজনীতি, প্রতীকের ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এবং কেন্দ্রীয় কৌশল। কে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাবেন, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আলোচনার ধরন দেখে মনে হয়, বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে না।








