সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অপসাংবাদিকতা’ বনাম মূলধারার প্রকৃত সাংবাদিকতা: সংকটে সমাজ ও রাষ্ট্র
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে আমাদের সমাজ এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নামে-বেনামে একটা ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে, হাতে একটা বুম (মাইক) নিয়ে নিজেকে ‘সাংবাদিক’ দাবি করার এক সস্তা প্রবণতা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ, সাংবাদিকতার মূল দর্শন, নীতি ও আদর্শের সাথে এদের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।
এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১. মূলধারার সাংবাদিকতা বনাম ফেসবুক-ইউটিউবের সস্তা চমক : প্রকৃত সাংবাদিকতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং নীতিগত প্রক্রিয়া। মূলধারার গণমাধ্যমে (টেলিভিশন, জাতীয় সংবাদপত্র, নিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল) যারা কাজ করেন, তাদের প্রতিটি শব্দ ও সংবাদের পেছনে থাকে সম্পাদকীয় নীতিমালা, জবাবদিহিতা এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কঠোর পরীক্ষা। তাদের পাঠানো একটি শব্দ বা একটি প্রতিবেদন সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
পক্ষান্তরে, ফেসবুক বা ইউটিউবকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা তথাকথিত সাংবাদিকদের বড় অংশই সাংবাদিকতার ‘স’ অক্ষরটিও জানে না। ভিউ (Views), লাইক আর সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে এরা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম (Clickbait), ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। এটি সাংবাদিকতা নয়, এটি স্রেফ ‘অপসাংবাদিকতা’।
২. জাতীয় গণমাধ্যমের কিছু ব্যক্তিবর্গের দায় ও অস্তিত্বের সংকট : সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, মূলধারার বা জাতীয় গণমাধ্যমের কিছু সিনিয়র ব্যক্তিবর্গও এই অপসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছেন। সামান্য কিছু টাকা বা সাময়িক ব্যক্তিস্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে তারা এই অপসাংবাদিকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এই চাটুকার ও ভুঁইফোড়দের মাথায় হাত রেখে তারা মূলত নিজেদের দীর্ঘদিনের অর্জিত ব্যক্তিত্ব, সম্মান এবং অস্তিত্বকে বিসর্জন দিচ্ছেন। অর্থের লোভে অন্ধ হয়ে এই জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা যখন অপসাংবাদিকদের বৈধতা দেন, তখন তা গোটা সাংবাদিক সমাজকে কলঙ্কিত করে।
৩. সাধারণ মানুষের সরলতা ও সস্তার মোহ : আমাদের সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ এখনো অত্যন্ত সহজ-সরল। তারা যখন ফেসবুক বা ইউটিউবে কোনো চটকদার ভিডিও বা কারো ছবি দেখে, তখন লোগো বা পেজের নাম না দেখেই সেটাকে আসল টিভি চ্যানেল বা জাতীয় গণমাধ্যম বলে ভুল করে। এই সরলতার সুযোগ নিয়ে অপসাংবাদিকরা সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ধোঁকা দিচ্ছে, বোকা বানাচ্ছে।
আসলে, “সস্তায় যা পাওয়া যায়, তার মান কখনোই ভালো হয় না।” কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই সস্তার মোহে পড়ে আসল আর নকলের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা খুব কম মানুষই করে। ফলে, এই সস্তা কোলাহলের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছেন সেইসব প্রকৃত ও দেশপ্রেমিক সাংবাদিকরা, যাদের সততা এবং কলমের ধার সমাজের আসল চিত্র তুলে ধরে।
৪. আমাদের করণীয়: সচেতনতা ও প্রতিরোধ
এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
জনগণকে সচেতন করা: সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, স্ক্রিনে একটা মাইক্রোফোন নিয়ে কথা বললেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না। তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে যেকোনো ফেসবুক পেজের ভিডিও বিশ্বাস বা শেয়ার করা বন্ধ করতে হবে।
অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো: স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রশাসন এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ভুঁইফোড়, অপেশাদার ও চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নীতিমালা বাস্তবায়ন: নামে-বেনামে গজিয়ে ওঠা পেজ ও চ্যানেলের মাধ্যমে যেন কেউ সাংবাদিকতার অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি।
অপসাংবাদিকতার এই বিষাক্ত ছোবল থেকে সমাজকে মুক্ত করতেই হবে। আমরা যদি আজ জনগণকে সচেতন না করি এবং এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে সমাজের আসল চিত্র কোনোদিন উঠে আসবে না। প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষা এবং একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বার্থে এখনই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করার সময়।
মোহাম্মদ ফিরোজ
গণমাধ্যম কর্মী








