ঢাকা | জুলাই ১৭, ২০২৬ - ৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

মির্জা ম্যানসনের বিস্ফোরণ: গ্যাসের ধারণা, তবু মিলছে না সব প্রশ্নের উত্তর

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Wednesday, July 15, 2026 - 11:47 am
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 14 বার

বিশেষ প্রতিবেদকঃ এক বিস্ফোরণে প্রাণ গেল ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ারের; চিকিৎসাধীন খোকন, তদন্ত চললেও নিরাপত্তা, দায়বদ্ধতা ও সম্ভাব্য অবহেলা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানাধীন আলীশানগর বন্দরটিলা কাঁচাবাজারের পেছনে অবস্থিত ছয়তলা ‘মির্জা ম্যানসন’-এ ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণ এখন আর শুধু একটি দুর্ঘটনার ঘটনা নয়। এতে ঝালমুড়ি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন (৪৫) প্রাণ হারিয়েছেন, গুরুতর আহত খোকন মিয়া এখনো চিকিৎসাধীন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে স্থানীয়দের মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কীভাবে জমেছিল গ্যাস, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, কোথাও কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না এবং দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কতটা ছিল। এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।

গত ৭ জুলাই দুপুরে টানা বর্ষণের মধ্যে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন ভবনের নিচতলায় হাঁটুসমান পানি জমে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হলে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

বিস্ফোরণের পর দগ্ধ অবস্থায় আনোয়ার হোসেনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, উদ্ধারকালে তিনি বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর গত ১১ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় আহত খোকন মিয়ার অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব ধরনের ব্যয় নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে বলেও তারা দাবি করেন।

খোকন মিয়ার পরিবারের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর ভবন-সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর বা কার্যকর সহযোগিতা তারা পাননি। আহতদের চিকিৎসা কিংবা মানবিক সহায়তায় দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও তাদের চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করেন তারা।

নিহত আনোয়ার হোসেনের ভাই দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই। যদি কারও অবহেলা বা গাফিলতি থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটি সামনে আসা উচিত।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিস্ফোরণের প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত হয়নি। নিচতলার কক্ষটি কী কাজে ব্যবহৃত হতো, সেখানে গ্যাস সংযোগের অবস্থা কী ছিল, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা দাহ্য উপাদান ছিল কি না এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই মিলতে হবে বলে তাদের অভিমত।

প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দেখা যায়, বিস্ফোরণের তীব্রতায় নিচতলার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশের একটি ফার্মেসির পেছনের দেয়ালের অংশ ভেঙে যায় এবং একটি লোহার শাটার ছিটকে পড়ে। তবে এসব আলামত বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ঘটনার সময় নিচতলায় অবস্থান করা এক নারীকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে তার পরিচয়, বর্তমান অবস্থা বা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার বিষয়ে ভবনের ইনচার্জ হিসেবে পরিচিত পলাশ বলেন, “বিস্ফোরণ কী কারণে হয়েছে, তা এখনো জানতে পারিনি।”

এদিকে বন্দরটিলার বিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর গত ১৩ জুলাই বিকেল ৪টা ২ মিনিটে ইপিজেড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আতিকুর রহমান হোয়াটসঅ্যাপ কলে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।

ওসি মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, “এখানে রহস্যজনক কিছু দেখছি না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।”

তিনি বলেন, “গ্যাস জমে থাকার পর আগুন ধরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। এ ঘটনায় একজন মারা গেছেন এবং আরও দুইজন আহত হয়েছেন।”

পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, “পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর অন্য কোনো কারণ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।”

তিনি আরও জানান, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে শুধু প্রাথমিক ধারণার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। গ্যাস লিকেজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঘটনাস্থলের আলামত—সবকিছুই কারিগরি ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবেই প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

বন্দরটিলার মির্জা ম্যানসনের বিস্ফোরণ একটি প্রাণহানির ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, দায়িত্বশীলতা এবং দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল প্রতিরোধযোগ্য কোনো ত্রুটি বা অবহেলা।

নিহত আনোয়ার হোসেনের পরিবার, আহত খোকন মিয়ার স্বজন এবং স্থানীয়দের একটাই দাবি—ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা হোক। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা কিংবা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।