ঢাকা | অক্টোবর ১১, ২০২৬ - ৯:০৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

সারওয়ার আলমকে ওএসডি: সততার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন, বাংলাদেশে জনগণ কী আশা করবে?

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Sunday, October 11, 2026 - 1:09 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 3 বার
প্রতিবেদক:এমডি নাসির, নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতা নয়—রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো সততা, ন্যায়বিচার, যোগ্যতা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা। কিন্তু যখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয় যে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন কি না, তখন সেই প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না।

বাংলাদেশে সারওয়ার আলমকে ওএসডি করার ঘটনা নিয়ে নানা মহলে যে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠছে, তা সেই বৃহত্তর উদ্বেগেরই অংশ। একজন কর্মকর্তা কেন ওএসডি হলেন—এর পেছনে প্রশাসনিক, সাংগঠনিক বা অন্য কোনো কারণ থাকলে সরকারের উচিত সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা। কারণ স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব বাড়ে, আর গুজব থেকে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়।

সততার মূল্য কোথায়?

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব সহজ—যিনি সততার সঙ্গে কাজ করবেন, তিনি যেন সম্মান পান; যিনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তার বিরুদ্ধে যেন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়; আর সরকারি পদায়নে যেন যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাই প্রধান বিবেচনা হয়।

কিন্তু যদি মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে তদবির, ব্যক্তিগত আনুগত্য, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা একজন মানুষের পদ ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া ঘুষখোর বা দুর্নীতিবাজ বলা উচিত নয়। তবে যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং সত্য প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা—এটাই একটি সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

‘আমি’ নয়, ‘আমরা’ ভাবতে হবে

বাংলাদেশের আরেকটি বড় সামাজিক সমস্যা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা। অনেক সময় আমরা ভাবি—“আমি কী পেলাম?” কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত—“দেশ কী পেল?”

নিজের পরিবার, নিজের চাকরি, নিজের ব্যবসা, নিজের পদ কিংবা নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন নাগরিকের দায়িত্ব সেখানেই শেষ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের কথাও ভাবতে হবে।

একজন সৎ কর্মকর্তা যখন জনগণের অর্থ, অধিকার ও রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষায় কাজ করেন, তখন তার সততার সুফল শুধু তার নিজের নয়—পুরো দেশের মানুষ পায়।

‘বুটলিকার’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি

একটি সুস্থ প্রশাসনে কর্মকর্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কাজ, দক্ষতা, সততা ও পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে। ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা ক্ষমতাবানদের খুশি করার সংস্কৃতি যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে যোগ্য ও স্বাধীনচেতা কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন।

ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য তোষামোদ করা এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নীতির সঙ্গে আপস করা কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ হতে পারে না।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন মানুষ দরকার, যারা প্রয়োজন হলে সত্য কথা বলতে পারবেন, ভুল সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারবেন এবং জনগণের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপরে রাখতে পারবেন।

জনগণ কী আশা করতে পারে?

বাংলাদেশের মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায়—

  • সৎ ও যোগ্য মানুষের মূল্যায়ন;
  • সরকারি পদায়নে স্বচ্ছতা;
  • দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত;
  • প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা;
  • প্রশাসনে জবাবদিহি;
  • আইনের চোখে সবার সমান অধিকার;
  • এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সারওয়ার আলমকে ওএসডি করার বিষয়টি যদি প্রশাসনিক প্রয়োজনের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা উচিত। আর যদি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া।

কারণ স্বচ্ছতা থাকলে সমালোচনা কমে, আর অস্বচ্ছতা থাকলে সন্দেহ বাড়ে।

শেষ কথা

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার।

সততা যেন দুর্বলতা না হয়, আর দুর্নীতি যেন ক্ষমতার ঢাল না হয়—এটাই হওয়া উচিত প্রত্যাশা।

একজন সৎ মানুষকে সম্মান করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; এটি সমাজের অন্য মানুষদেরও সততার পথে উৎসাহিত করে।

আর একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যদি প্রভাব বা ক্ষমতার কারণে পার পেয়ে যান, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা থাকে না—তার প্রভাব পুরো সমাজের ওপর পড়ে।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হোক, যেখানে ‘কে কাকে চেনে’ নয়, ‘কে কতটা যোগ্য ও সৎ’—সেটিই হবে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।

জনগণের প্রশ্ন তাই একটাই—
সততার মূল্য যদি না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে আর কী আশা করবে?