ঢাকা | অক্টোবর ১৮, ২০২৬ - ৯:৪৫ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

মানুষের জীবনের চেয়ে ব্যবসার মুনাফা বড় হতে পারে না

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Sunday, October 18, 2026 - 1:07 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 16 বার
প্রতিবেদক: এমডি নাসির, নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করছি। এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ও আনন্দ কেড়ে নেয়নি, বরং পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।

একটি রিসোর্ট মানে শুধু সুন্দর কক্ষ, সমুদ্রের দৃশ্য, আকর্ষণীয় সাজসজ্জা কিংবা ব্যবসার মুনাফা নয়। সেখানে মানুষের নিরাপদে থাকা, ঘুমানো এবং বিপদের সময় দ্রুত বেরিয়ে আসার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও পরিবারের সদস্যরা যখন অবকাশ যাপনের জন্য কোনো রিসোর্টে যান, তখন তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেন, প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।

কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে, জরুরি বহির্গমনপথ কার্যকর না হলে কিংবা আগুন লাগার পর দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা না থাকলে সেই ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়—এ প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।

নিউইয়র্কের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

আমি নিউইয়র্কের ইন্টারকন্টিনেন্টাল নিউইয়র্ক টাইমস স্কয়ার হোটেলের বনকোয়েট বিভাগে কাজ করি। হোটেলশিল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝি, একটি অতিথিসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু ভালো সেবা দেওয়া কিংবা আয় বাড়ানো নয়; অতিথি ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

নিউইয়র্কে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনুমতি, লাইসেন্স এবং নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হয় এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।

বাংলাদেশেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাবিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। একটি রিসোর্ট দেখতে সুন্দর হলেই কিংবা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারলেই সেটিকে নিরাপদ বলা যায় না। নিরাপত্তার বাস্তব প্রমাণ থাকতে হবে।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, কার্যকর অ্যালার্ম, জরুরি বহির্গমনপথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া—এসবকে অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক ব্যবস্থা।

দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাব

বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হলে, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন করেও যদি পার পেয়ে যায়, কিংবা নিয়মিত তদারকির অভাব থাকে, তাহলে এর দায় শুধু ব্যবসায়ীর ওপর চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে তদন্তের আগে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির জন্য দায়ী করা ঠিক হবে না। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, রিসোর্টটির অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা—সবকিছু স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আনতে হবে।

আমাদের দেশে অনেক সময় ব্যবসার আয়, প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং পর্যটক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ব্যবসায় মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ? লাভের হিসাব করতে গিয়ে যদি নিরাপত্তার হিসাব বাদ পড়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সব আয়োজনই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

টাকা নয়, মানুষের জীবনই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

একটি রিসোর্ট তৈরি করতে অর্থ লাগে, ব্যবসা পরিচালনা করতে বিনিয়োগ লাগে, আর ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে মুনাফাও প্রয়োজন। কিন্তু কোনো ব্যবসার মুনাফাই মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না।

কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শুধু নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া নয়; প্রতিষ্ঠানগুলো আইন মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করাও। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন, স্বচ্ছ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা জরুরি।

এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন:

  • রিসোর্টটিতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না?
  • প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স নিয়েছিল কি না?
  • আগুন লাগার পর অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না?
  • সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করেছিল কি না?
  • তদন্তে অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শুধু এই দুর্ঘটনার কারণই জানা যাবে না, ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধের পথও তৈরি হবে।

এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের সব পর্যটন এলাকায় হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে পর্যালোচনা করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর নিরাপত্তাঘাটতি থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবসা বন্ধ বা পরিচালনার অনুমতি স্থগিত করার মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করতে হবে।

পাশাপাশি, কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনার পর তদন্ত শুরু করাই যথেষ্ট নয়; দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই দায়িত্বশীল প্রশাসনের পরিচয়।

শেষ কথা

টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের প্রাণহানির খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।

আমার বক্তব্য কাউকে আগেভাগে অপরাধী সাব্যস্ত করা নয়। আমি চাই, প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে না হোক।

আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই—যেখানে ব্যবসার মুনাফা মানুষের জীবনের চেয়ে বড়, নাকি যেখানে মানুষের নিরাপত্তাই সব ব্যবসার প্রথম শর্ত?

আমার বিশ্বাস, একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রে মানুষের জীবনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। ব্যবসা হবে, মুনাফা হবে, পর্যটনশিল্পের বিকাশ হবে—কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে নয়।

মানুষ বাঁচলে ব্যবসা বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে দেশ এগোবে। টাকা দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়, কিন্তু হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না।

Inline image