ঢাকা | অক্টোবর ১৮, ২০২৬ - ৮:৪৮ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

শিক্ষা সংকট ও দ্রব্যমূল্যের প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ১২০০

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Sunday, October 18, 2026 - 1:06 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 18 বার
প্রতিবেদক: এমডি নাসির, নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)প্যারিস: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছিল।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১১০টি মিছিলে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) ও আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় আট লাখ। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন।

শিক্ষা সংকটের সঙ্গে যুক্ত জীবনযাত্রার ব্যয়

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষকসংকট, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষও যুক্ত হয়েছে।

শ্রমিক সংগঠন সিজিটি মজুরি ও পেনশন বাড়ানো, দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো এবং জনসাধারণের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা সুরক্ষিত রাখার দাবি জানিয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শিক্ষা ও জনসেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ

প্যারিসে বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় মুখোশধারী কয়েকটি গোষ্ঠী পুলিশের দিকে আতশবাজি, পাথর ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকটি গাড়ি, সাইকেল, আবর্জনার পাত্র ও একটি সংবাদপত্রের কিয়স্কে আগুন দেওয়া হয়। পাশাপাশি কয়েকটি দোকানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

প্যারিসের বাইরেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। লিমোজ শহরের সিটি হলে আগুন লাগার পর ভবনের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। লিওঁতে পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মার্সেইয়ে কয়েকটি দোকান ও একটি পৌর পুলিশ কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু বিক্ষোভকারী অল্প সময়ের জন্য সিটি হলের প্রবেশকক্ষেও প্রবেশ করেন।

এ ছাড়া রেন, তুলুজ ও গ্রেনোবলসহ আরও কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সরকারের

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার রক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, সহিংসতার মাধ্যমে কেউ সরকারের ওপর নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে অস্থিরতায় প্রায় ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলা হলেও আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন

বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ব্যবহৃত কৌশল নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সাঁত-এতিয়েনে এক তরুণ বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়ে একটি হাত হারানোর ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পুলিশের ব্যবহৃত গ্রেনেড বিস্ফোরণে ওই তরুণ আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। ঘটনাটি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগের সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতিতেও থামেনি আন্দোলন

শিক্ষা খাতের সংকট মোকাবিলায় শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে গত ৮ অক্টোবর অতিরিক্ত তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সেই ঘোষণার পরও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়মিত পাঠদান এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে অনড় রয়েছে।

রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর

ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ দেশটির শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন। আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে আন্দোলনের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের সামনে এখন দুটি বড় দায়িত্ব—একদিকে সহিংসতা বন্ধ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা। আন্দোলন কত দ্রুত প্রশমিত হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতির ওপর।

Inline image