ঢাকা | মার্চ ১০, ২০২৬ - ১২:৫৩ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

মানব পাচার চক্র: বনানী থেকে মিরপুর—প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এক ভয়ংকর প্রতারণার নেটওয়ার্ক

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Saturday, April 19, 2025 - 3:46 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 613 বার

এম এ, নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ – আমেরিকা, ইসরাইল, রাশিয়া, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু প্রতারণাই নয়—এই চক্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের গোপন যোগসাজশেরও প্রমাণ মিলেছে।

প্রতারকের মুখোশে হিরো, পিয়াস, ফজল এবং তানভীর!
এই চক্রের মূল হোতা মোঃ আবু বক্কর (হিরো), বয়স ৩৪। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পিয়াস (৩৫), ফজলুর কাদের (৫৮), এবং ভুয়া ভিসা তৈরির কারিগর তানভীর। তারা বিদেশে ভিসা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে মোটা অঙ্কের টাকা নেয় এবং পরে তাদের হাতে তুলে দেয় ভুয়া ভিসাযুক্ত পাসপোর্ট।

ভুক্তভোগী বনানীর ব্যবসায়ী মোঃ জাহান জানান, বৈধ উপায়ে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসায় যুক্ত থাকায় সেই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে হিরো তার বিশ্বাস অর্জন করে। পরে তার নাম ও পরিচিতিকে ব্যবহার করে বহু মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা চালায়।

রাশেদুল, আসাদুজ্জামান ইমান, রিউয়াজ উদ্দিন, মোহাম্মদ সেলিম মিয়া, মোঃ আমির হামজা, রুপক একন, ওমি হাসান, রায়হান, মশিউর রহমান মুন্না, মুন্না ব্যাপারি সহ অনেক সাধারণ মানুষকে ‘উন্নত জীবনের’ স্বপ্ন দেখিয়ে বিপজ্জনক রুটে পাঠিয়ে দেয়।

এদের মধ্যে কেউ পৌঁছাতে পারেননি, অনেকের পাসপোর্ট আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করছে হিরু ও পিয়াস। এক ভিডিওতে পিয়াস নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তার অফিসে ৪০টির বেশি পাসপোর্ট রাখা আছে।

বিষয়টি বুঝতে পেরে মোঃ জাহান বনানী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই মামুন। কিন্তু অভিযোগের দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং, এক পুলিশ কনস্টেবল তাকে মামলা ‘মিটমাট’ করার প্রস্তাব দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মামুন সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানান।

পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট করতে বনানী থানার অফিসার ইন চার্জ রাসেল আহমেদ (ওসির) সাথেও যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তার কাছ থেকেও কোনো সহানুভূতিশীল বা সহায়ক মনোভাব পাওয়া যায়নি। বরং তিনি বলেন, “মামুন নিজেকে কিভাবে রক্ষা করবে, সেটা সে ভালো জানে।”

ওসির এই মন্তব্য প্রশাসনের ভেতরে দায়িত্বহীনতা ও প্রভাবশালী প্রতারকদের প্রতি একধরনের প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত দেয়, যা জনমনে আরও গভীর প্রশ্ন তোলে।

অন্যদিকে, প্রতারণা চক্রের অন্যতম সদস্য পিয়াসের অফিস মিরপুর বাইক পট্টিতে। এখান থেকেই পরিচালিত হতো পাসপোর্ট সংগ্রহ, অর্থ লেনদেন এবং প্রতারণার সব কার্যক্রম।সাংবাদিকরা সেখানে সরেজমিনে গেলে পিয়াস উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং সাংবাদিকদের “ভুয়া” বলে গালাগালি শুরু করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন মিরপুর থানার এসআই মেহেদী। তিনি সাংবাদিকদের কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে পিয়াসের সঙ্গে গোপনে কথা বলেন । এমনকি পিয়াসের দেওয়া একটি ভিজিটিং কার্ড নিজের পকেটে তুলে নেন—যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

পুলিশের আচরণে উঠছে বড় প্রশ্ন ?
বনানী থানার এসআই মামুন এবং মিরপুর থানার এসআই মেহেদীর আচরণ এই মানব পাচার চক্রের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অংশের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। কেন একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? কেন তদন্তের নামে চলছে নীরবতা?

এই চক্র শুধু প্রতারণায় সীমাবদ্ধ নয়—এরা সরাসরি মানব পাচারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন, রাশিয়ার মতো বিপজ্জনক এলাকায় মানুষ পাঠিয়ে তারা ভুক্তভোগীদের জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।

তদন্ত নামেই চলছে, কিন্তু সত্য কতদূর?
এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তদন্তের নামে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং, সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এবং তথ্য গোপনের স্পষ্ট চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—এই চক্রের পেছনে কি সত্যিই কেউ আছে, যারা তাদের রক্ষা করছে?

(অনুসন্ধান অব্যাহত…)………………………………..