ঢাকা | মার্চ ১০, ২০২৬ - ১২:৩২ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে কমপক্ষে একটি টার্মের (পাঁচ বছর) জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা-:মুহম্মদ আজিজুল হক

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Monday, May 12, 2025 - 2:01 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 779 বার

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত-:একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় নির্বাচনের পর যে সরকার/দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের সাংসদদের উচিত হবে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে কমপক্ষে একটি টার্মের (পাঁচ বছর) জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা। সরকারের নিজ স্বার্থে ও সাফল্যের জন্য এটা করা উচিত। কারণ, ড. ইউনুসের আছে বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও খ্যাতি। বলতে গেলে বিশ্বে এমন কেউ নেই যার  কাছে তিনি পৌঁছতে পারেন না। এমন কোনো নেতা নেই যে তাঁর কথা মনোযোগ সহকারে শুনবেন না। তাছাড়া, তিনি একজন অত্যন্ত বিনয়ী, নির্লোভী, নিরহংকারী, শিষ্টাচারী, ও শুদ্ধাচারী মানুষ; যেমনটি একজন নোবেল লরিয়েটের বা অত্যন্ত বড় মাপের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের নিকট মানুষ প্রত্যাশা করে। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও এই মহান ব্যক্তিত্বকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল।

তিনি তাঁর প্রবর্তিত মাইক্রো ক্রেডিটের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শতাধিক দেশের বহু মিলিয়ন দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র-রেখার ঊর্ধে উঠিয়েছেন, স্বাবলম্বী করেছেন। ২০০৬ সালে তিনি যখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান, আমি তখন সুইডেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। সুইডেনের রাজধানী স্টকহলমে ছিল আমার আবাসস্থল। কিন্তু একই সময়ে সমবর্তী দায়িত্ব হিসেবে আমি নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, এবং আইসল্যান্ডেও আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূত ছিলাম। ঐসব দেশেও মাঝে মাঝে আমাকে অফিসিয়াল ভিজিটে যেতে হতো। এটা আমার জন্য একটি সৌভাগ্যের বিষয় বলে আমি মনে করি যে ঐসব দেশে আমি রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন সময়ে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা সুইডেনের Alfred Nobel তাঁর উইলে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার (Nobel Peace Prize) প্রদানের বিষয়টি নরওয়ে (Norwegian Committee) দেখবে বলে ইচ্ছা প্রকাশ কোরেছিলেন। অন্যান্য সব নোবেল পুরস্কারগুলি সুইডেনই দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি/অফিসিয়ালস ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের আনুষ্ঠানিকতার সাথে আমাকে সম্পৃক্ত রাখে। কাজেই আমাকে ঐ সময়ে নরওয়ে যেতে হয়েছিল। সন্ধ্যারাতে তাদের সাথে আমিও এয়ারপোর্টে ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তাঁর সাথে আগত সবাইকে রিসিভ করি। তাঁকে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধিকে (মোসাম্মত তসলিমা বেগম) তাঁদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
>>> স্মরণ করা যেতে পারে যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রফেসর ইউনুসের পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংককেও দেয়া হয়েছিল। Nobel Peace Prize প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা তিন দিন ধরে চলে। সেই ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল ৯ই ডিসেম্বর একটি প্রেস কনফারেন্স ও নোবেল

লরিয়েটকে একটি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে। CNN-এর প্রখ্যাত anchor/journalist Mr. Jonathan Mann অসলোতে এসে প্রফেসর ইউনুসের ইণ্টারভিউ নেন। টেলিভিশনে সেটি সম্প্রচারিত হয়। ১০ই ডিসেম্বর তারিখে Oslo City Hall-এ তাঁকে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি মহিলাকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ওটাই প্রধান অনুষ্ঠান। সেখানে নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান নোবেল লরিয়েটকে Nobel Peace Prize Medal এবং Diploma-য় ভূষিত করেন। অডিয়েন্সে ছিলেন নরওয়ের রাজা এবং রানী, মন্ত্রীগণ, উচ্চতম পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিদেশী

কূটনীতিকগণ, এবং নরওয়ের বিশিষ্ট নাগরিকেরা। ড. ইউনুস তাঁর লিখিত বক্তব্য রাখেন, যেটাকে বলা হয় Nobel Lecture। তাঁর লেকচারে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক, দারিদ্র বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে মাইক্রো ক্রেডিটের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। প্রাইজের টাকাটা বোধকরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল। তিন দিনের অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত ছিল নোবেল বিজয়ীদ্বয়ের সম্মানে নরওয়েজিয়ান পিস কাউন্সিল কর্তৃক আয়োজিত ১০ই ডিসেম্বর ২০০৬ তারিখের সন্ধ্যায় একটি মশাল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি শুরু হয়েছিল নোবেল পিস সেন্টারে এবং শেষ হয় অসলোর বিখ্যাত গ্রান্ড হোটেলের সম্মুখে এসে। নোবেল বিজয়ীদ্বয় হোটেলের ব্যালকোনি থেকে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদেরকে গ্রীট করেন। নোবেল বিজয়ীরা যেহেতু বাংলাদেশের এবং আমি যেহেতু নরওয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তাই

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি গ্রান্ড হোটেলেই নোবেল কমিটির সদস্যদের এবং নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস এবং তাঁর সাথে আগত বিশিষ্টজনদের জন্য একটি ফরমাল লাঞ্চ হোস্ট করি। নোবেল পুরস্কার প্রদান উদযাপন সংশ্লিষ্ট যত ইভেন্ট ছিল তার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ইভেন্টটি ছিল অসলো স্পেকট্রাম নামের একটি বিশাল আয়তনের সুদৃশ্যৃ হলে অনুষ্ঠিত The Nobel Prize Concert। পাশ্চাত্য জগতের কতিপয় খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পীদের আনা হয়েছিল এই কনসার্টের জন্য। তাঁদের মধ্যে বিশ্ব বরেণ্য শিল্পী ইউসুফ ইসলাম (যিনি আগে খ্রীষ্টান ছিলেন) এবং ড. ইউনুসের মেয়ে মনিকা ইউনুস ও ছিলেন।

মনিকা ইউনুস একজন বিখ্যাত অপেরা গায়িকা (Operatic Soprano)। নিউ ইয়র্কে থাকেন। আমি জীবনে অনেক কনসার্ট দেখেছি, কিন্তু ঐ কনসার্টের মতো অতো উঁচু মানের এবং সুরেলা কনসার্ট কখনো দেখি নি। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশ থেকেও একটি শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীদের তাঁর সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই গোষ্ঠীর নামটা মনে নেই। তারাও ওখানে পারফর্ম কোরেছিলেন। অসলোতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ এবং অন্যান্য সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি সুইডিস নোবেল মিউজিয়ামের আমন্ত্রণে স্টকহলমে যান। সুইডেনেস্থ বাংলাদেশ কমিউনিটি নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে একটি সম্বর্ধনা দেয়।

>>> নোবেল পীস প্রাইজ ছাড়াও ড. মুহাম্মদ ইউনুস বিপুলস্ংখ্যক অন্যান্য বিশ্বসেরা পুরস্কার লাভ কোরেছেন, যার মধ্যে রয়েছে Ramon Magsaysay Award (১৯৮৪), the Independence Day Award (১৯৮৭), The US Presidential Medal of Freedom (২০০৯), the Congressional Gold Medal (২০১০)। Time Magazine সম্প্রতি (এপ্রিল ১৬, ২০২৫) সারা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রকাশ কোরেছে, যার মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম একেবারে ওপরের দিকে আছে শুনেছি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক, যুক্ত্ররাজ্যের প্রধান মন্ত্রী কেইর স্টারমারও ঐ লিষ্টে আছেন।

>>> যাহোক, ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে নোবেল প্রাইজ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে সবিস্তারে লেখা আমার এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য তিনি কত বড় একজন ব্যাক্তিত্ব, কী বিশাল তাঁর অর্জন সেটি একটু স্মরণ করা। তিনি একজন High Achiever এবং তিনি জানেন কিভাবে কিছু অর্জন কোরতে হয়। আমরা যদি তাঁকে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাই, তাহলে তাঁর বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তি ও   প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দেশকে আর্থ-সামাজিক ও ভূ-রাজনৈ্তিক দিক দিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।