ঢাকা | মার্চ ১০, ২০২৬ - ৫:২০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

কুলাউড়ায় গ্রামীণ স্বাস্থ্য পুনর্বাসনে অকুপেশনাল থেরাপি অনুষ্ঠিত

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Monday, September 29, 2025 - 5:02 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 454 বার

কুলাউড়া প্রতিনিধি:: মৌলভীবাজার থেকে- কুলাউড়া উপজেলার ব্রাক্ষনবাজার ইউনিয়নে গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সমাজভিত্তিক পুনর্বাসনের শিক্ষামূলক প্লেসমেন্টের উদ্দেশ্যে দেশের স্বনামধন্য পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সি আর পি) এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন ইন্সটিটউট থেকে কুলাউড়া,গোবিন্দপুর,

মৌভীবাজার,সিলেট সিআরপি গেস্ট হাউজে এসেছিল অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের উনিশ জন শিক্ষার্থী এবং দুজন শিক্ষকসহ একটি দল।

অকুপেশনাল থেরাপি হলো এক ধরনের স্বাস্থ্যসেবা, যেখানে শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক সমস্যায় ভুগছেন এমন মানুষকে দৈনন্দিন কাজকর্মে স্বনির্ভর ও জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করে থাকে। অকুপেশনাল থেরাপিস্টরা প্রথমে রোগীর সমস্যা মূল্যায়ন করে, প্রয়োজন বোঝেন এরপর ধাপে ধাপে প্রয়োজন অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করে থেরাপি প্রদানের মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ শেখানো (খাওয়া, পোশাক পরা, পড়াশোনা ইত্যাদি),ব্যায়াম ও শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধি, শিশুদের জন্য খেলার মাধ্যমে থেরাপি, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে কগনিটিভ ও বিহেভিয়রাল ট্রেনিং,কাজের দক্ষতা বা পেশাগত প্রশিক্ষণ, হুইলচেয়ার ও সহায়ক যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও পরিবেশের পরিবর্তন করে থাকে।

গোবিন্দপুর গ্রামের রাস্তাগুলো খুব চেনা নয় ঢাকার সাভার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে। আগমনের ঠিক পরদিনই সকালবেলা অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্রাক্ষণবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রথমত তারা জরিপ করে খুঁজে বের করে সেই মানুষগুলোকে, যাঁদের জীবন থমকে আছে, এক বা একাধিক প্রতিবন্ধকতার কারণে। তিন দিন ব্যাপী এই জরিপ কার্যক্রমে খুঁজে পান মোট ১১৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যাক্তি। এদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ৮৬%, সেরেব্রাল পালসি ১৪%,বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ৯%,মানসিকভাবে অসুস্থ ৩%,ডাউন সিনড্রোম ৩%,অটিজম আক্রান্ত শিশু ২%, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ১% ।

তাদের মধ্যে কারো হাঁটতে কষ্ট হয়, কেউ বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেন না। কিন্তু প্রত্যেকের পেছনে ছিল একেকটা আলাদা গল্প যেমন: কারো প্যারালাইসিসের গল্প, কেউ আবার জন্মগতভাবে সমস্যায় আক্রান্ত, অথবা কেউ মানসিকভাবে বিষণ্ণ। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ১১৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ২৮ জনকে রোগের গুরুত্বের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়। পরবর্তীতে তাদের সমস্যা সনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন অকুপেশনাল থেরাপি

বিভাগের শিক্ষার্থীরা।এ কার্যক্রমের আওতায় অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা মোট ২৫২টি সেশন পরিচালনা করে।প্রতিদিন, প্রতিটি রোগীর জন্য বরাদ্দ থাকত এক ঘণ্টার অকুপেশনাল থেরাপি সেশন ।সাধারণত অকুপেশনাল থেরাপি বলতে আমরা বুঝি হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ব্যয়বহুল সরঞ্জাম। কিন্তু এখানে গল্পটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন কীভাবে সহজলভ্য উপকরণ যেমন: বাঁশ, কাঠ, পুরনো পানির বোতল, টিন,

এমনকি মাটি ব্যবহার করেও একজন মানুষকে স্বনির্ভর করে তোলা যায়।এর মধ্যে একজন স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য টয়লেট পর্যন্ত সহজে হাঁটার সুবিধার্থে বাঁশের হ্যান্ড রেইল স্থাপন করা হয়েছে। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে র‍্যাম্প‍, যাতে তিনি খুব সহজেই তার ঘরে প্রবেশ করতে পারেন।অন্যদিকে, এক সেরেব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশুর জন্য তৈরি করা হয়েছে মডিফাইড চামচ, যার মাধ্যমে সে নিজ হাতে খাবার খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একইভাবে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা একজন

ব্যক্তির জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ নির্দেশনামূলক বই, যা তাকে তার সমস্যা চিহ্নিত করতে ও সমাধানের পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করছে।এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ শুধু তাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করছে না, বরং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেউ হয়তো প্রথমবার নিজের জামা নিজে পরতে পেরেছে, কেউ নিজে নিজে ব্রাশ করতে পেরেছে ,কেউ খেতে পেরেছে নিজ হাতে,কেউ নিজে নিজে চুল আচড়াতে পেরেছে এগুলো ছোট অর্জন মনে হতে পারে কিন্তু যাদের জীবন ছিল স্থবির, তাদের কাছে এই ছোট ছোট অর্জনই একেকটা জীবন বদলে দেওয়া মুহূর্ত ।

এছাড়াও তারা দুটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ,যার একটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউসুফ তৈয়ুবুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং অন্যটি জালালাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখানে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা হয়

যার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জানতে পেরেছে যেমন: স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি,সেরেব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার ইত্যাদি এবং সেই সাথে রোগের প্রতিকার, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে পেরেছে।এটার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে একাধিক “উঠান বৈঠক” করা হয় যেটি সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো হয়তো একদিন আরও বড় পরিসরে সমাজকে বদলে যাবে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট প্রায় ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ বসবাস করছেন। অথচ তাদের পুনর্বাসন ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরিয়ে আনার অন্যতম মাধ্যম অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সংখ্যা মাত্র ৪৯৬ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৭২০০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট বরাদ্দ রয়েছেন।

এ অবস্থাকে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সীমিত ও অপর্যাপ্ত বলা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে ১১৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের দুইজন শিক্ষক এবং ১৯ জন শিক্ষার্থী ছিল। এই ঘাটতি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সঠিকভাবে অকুপেশনাল থেরাপি ও পুনর্বাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন, যা তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদ