ঢাকা | জুন ৮, ২০২৬ - ৯:১৩ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

ঢাকা : মেট্রোপলিটন থেকে র‌্যাট্রোপলিটন –অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Monday, June 8, 2026 - 12:13 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 24 বার

(দ্বিতীয় কিস্তি ): বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি এবং জলবায়ু ইঁদুরের বসবাসের এবং বংশবিস্তারের অনুকূল । পৃথিবীতে প্রায় ২৭০০ বা তারও বেশি প্রজাতির ইঁদুর জাতীয় প্রাণী শনাক্ত করা গেছে । আমাদের দেশের প্রজাতিগুলোর মধ্যে এমন ইঁদুরও আছে যাদের এক জোড়া ইঁদুর থেকে বছরে চক্রবৃদ্ধি হারে গড়ে প্রায় দুই হাজার পর্যন্ত ইঁদুর জন্ম হয় । এদের সংস্পর্শে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এ ঝুঁকির মাত্রা আরো বেশি, যা আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । এখন প্রশ্ন হচ্ছে পরিত্রাণের উপায় কি ? উত্তর দুইটা- পালিয়ে যাওয়া অথবা তাড়িয়ে দেওয়া । ইঁদুরের ভয়ে ঢাকা শহর থেকে আমাদেরকে পালিয়ে যেতে হবে এটা তো ভাবাই যায় না । অতএব একমাত্র উপায় হচ্ছে ইঁদুর তাড়ানো অথবা অন্তত এদের সংখ্যা সীমিত করার চেষ্টা করা ।

 

বিশ্বের অন্যান্য বড় ম্যাগাসিটিগুলোর তুলনায় ইস্তাম্বুল শহরে ইঁদুরের উপদ্রব একেবারেই নগণ্য, চোখে পড়ার মত নয় । নিউইয়র্ক, প্যারিস বা লন্ডনের মত শহরগুলো যেখানে ইঁদুরের যন্ত্রণায় জর্জরিত সেখানে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বা প্রকাশ্যে ইঁদুর ঘুরে বেড়াতে দেখা অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা । ইস্তাম্বুলকে বলা হয় বিড়ালের শহর (Catstanbuls) । এই শহরের রাস্তায় দেড় লক্ষ বিড়াল স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায় । যদিও এখানকার মানুষ বিড়ালদের নিয়মিত খাবার দেয় ( বিড়ালগুলো ইঁদুর খেয়ে বাঁচে না ) , তারপরও বিড়ালের উপস্থিতি ও এবং গায়ের গন্ধ ইঁদুরের জন্য একটি প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে । বিড়ালের ভয়ে ইঁদুররা মূল রাস্তায় বা রেস্তোরাঁগুলোর আশেপাশে আসার সাহস পায় না । তুর্কি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উচ্চমাত্রার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, রাস্তায় খোলা খাবার বা আবর্জনা না ফেলা, এবং দ্রুত পরিষ্কার করা । ইঁদুররা সহজে খাবারের সন্ধান পায় না । ঢাকায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করা গেলে বিড়ালের সংখ্যা বাড়িয়েও ইঁদুর কমানো যাবে না । কারণ আমরা যেভাবে খোলা জায়গায় ময়লা আবর্জনা ফেলি বা স্তুপ করে রাখি, এতে বিড়াল এবং ইঁদুর উভয়ই প্রচুর খাবার পাবে । উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেওয়া উচিষ্ট খাবার উভয় প্রজাতি ভাগাভাগি করে খেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলবে । বর্জ্য থেকে ইঁদুর খাবার না পেলে তাদের সংখ্যা এমনিতেই কমবে । একইভাবে বিড়ালের সংখ্যা বাড়লে তাদেরও খাবারের টান পড়লে কিছু বিড়াল ইঁদুর মেরে খাবে । তাছাড়া বিড়ালের তাড়া খেয়ে এবং বিড়ালের উপস্থিতির কারণেই কিছু ইঁদুর পালাবে ।

 

১৯৭০ এর দশকে প্রথম যখন ঢাকায় এসেছিলাম তখন ঢাকাকে মনে হয়েছিল “কাকের শহর” । গ্রামাঞ্চলে যে ধরনের কাক দেখা যায় তারচেয়ে ঢাকার কাক ছিল একটু ভিন্ন । গ্রামের বসবাসকারী কাকগুলো দাঁড় কাক । ঢাকার রমনা পার্ক ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কিছু দাঁড় দেখতে পাওয়া যায় । এগুলো ঢাকায় বসবাসকারী পাতি কাকের চেয়ে বড়, কুচকুচে কালো, ঠোঁট অনেক বেশি ভারী ও বাঁকানো, গলার স্বর পাতি কাকের চেয়ে বেশ গম্ভীর ও কর্কশ । ঢাকায় বসবাসকারী পাতিকাকগুলোর ঘাড়,গলা ও বুকে ধূসর বা ছাই রঙের একটি আবরণ থাকে । এদের গায়ের রং কুচকুচে কালো নয় , অনেকটা ধূসর রঙের ; আকারেও দাঁড় কাকের চেয়ে ছোট । তবে শহুরে পাতিকাকগুলো মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে । ঢাকার আকাশে তখন প্রচুর চিল দেখা যেত, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অসংখ্য চিলের আবাস ছিল । জগন্নাথ হল ও শামসুন্নাহর হল এলাকায় খুব উঁচু কয়েকটি গাছ ছিল । সন্ধ্যা হলেই অসংখ্য চিল এই গাছগুলোতে এসে বসত । এখন ঢাকার আকাশে চিল দেখা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার । কাকের সংখ্যাও এত সীমিত যে খুব কমই এখন কাক চোখে পড়ে । লক্ষ্মী পেঁচা দেখার জন্য একমাত্র চিড়িয়াখানা যাওয়া ছাড়া এখন আর কোন উপায় নেই । একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং পুরনো ঢাকায় প্রচুর লক্ষী পেঁচার বসবাস ছিল । কাক ও চিলের সৌখিন খাবার ছিল ইঁদুর এবং ইঁদুরের বাচ্চা । দিনের বেলায় কাক ও চিলের ভয়ে ইঁদুর গর্ত থেকেই বের হতো না । রাতে বের হলে পেঁচার শিকারে পরিণত হতো । প্রাকৃতিক উপায়ে ইঁদুরের সংখ্যা সীমিত করতে চাইলে অন্যতম একটি উপায় হবে ঢাকায় কাক-চিল ও পেঁচার সংখ্যা বৃদ্ধি করা । এর জন্য শহরের বিভিন্ন জোনে উঁচু ‘পকেট ফরেস্ট’ বা ‘গ্রিন জোন’ তৈরি করা । কাক-চিল প্রধানত বড় ও উঁচু গাছে ( রেইনট্রি, বট, কড়ই ) বাসা বাঁধে । উঁচু গাছ লাগানোর জন্য বনবিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনকে ভূমিকা নিতে হবে । ঢাকায় কাক কমে যাওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো ডাস্টবিনে ফেলা রাসায়নিক ও বিষাক্ত বর্জ্য । বর্জ্যে উচ্ছিষ্ট খাবার ও রাসায়নিক আলাদা করা নিশ্চিত করা গেলে কাক নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাবার পাবে এবং তাদের মৃত্যুর হার কমবে । ঢাকায় লক্ষ্মী পেঁচার সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে । বিড়াল বা কাকের চেয়ে ইঁদুর নিধনে লক্ষ্মী পেঁচা শতগুণ কার্যকর ‌। বেশিরভাগ সময়ে ইঁদুর রাতেই গর্ত থেকে বের হয়ে আসে । নিশাচর লক্ষ্মী পেঁচা তখন নিখুঁতভাবে ইঁদুর শিকার করতে পারে । ভবনের চিলেকোটায়, ব্যালকনিতে, অন্ধকার কোণে বা পার্কের গাছে কাঠের তৈরি বিশেষ ‘owl box’ ঝুলিয়ে দিলে পেঁচারা সেখানে বসবাস ও বংশবৃদ্ধি করতে পারবে । এসির আউটডোর ইউনিট এবং বিলবোর্ডের পেছনে পেঁচাদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়া যেতে পারে । বিষাক্ত কীটনাশক ও ইঁদুর মারার জন্য বিষ ব্যবহার করলে মরা ইঁদুর বা পোকামাকড় খেয়ে কাক-চিল ও পেঁচা সেকেন্ডারি বিষক্রিয়ায় মারা যেতে পারে । মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । শহরে কাক-চিল জাতীয় পাখি কমে যাওয়ার বড় কারণ মোবাইল ফোনের টাওয়ারের উচ্চ বিকিরণ । আন্তর্জাতিক নিয়মের মধ্যে রেডিয়েশন সীমিত করা না গেলে পাখির প্রজনন ও ওড়ার দিকভ্রান্ত হওয়া রোধ করা যাবে না । শহরে কাকের সংখ্যা কমে গেলে উচ্ছিষ্ট খাদ্যের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং সব খাবার ইঁদুর একাই খাবে । দিনের বেলাতেও ইঁদুরের অবাধ বিচরণ ঠেকানো যাবে না, কারণ কাক না থাকায় ইঁদুর কাউকে ভয় করবে না ।

 

ঢাকার ভেতরের জলাশয় (যেমন – হাতিরঝিল, ধানমন্ডি ও গুলশান লেক) এবং চার পাশের নদীগুলোতে (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ,শীতলক্ষা ) নির্দিষ্ট কিছু মাংসাসি ও শিকারী প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানো গেলে ঢাকা শহরে ইঁদুরের সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক কমে আসবে । ঢাকার সাভার,আশুলিয়া বা ডেমরার জলাভূমিতে মেছো বিড়াল বা মেছো বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে । এশীয় ডোরাকাটা গুইসাপকে প্রাকৃতিক পরিছন্নতা কর্মী বলা হয় । এরা ড্রেন, কালভার্ট ও গর্তের ইঁদুর খুঁজে বের করে খায় । হাতিরঝিল ও অন্যান্য লেকে এদের সংখ্যা বাড়ানো গেলে আশেপাশের এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব কমে আসবে । উদবিড়াল বা ভোদড় (Otter) অত্যন্ত চটপটে, এরা পানির পাশাপাশি স্থলেও সমান দক্ষতায় শিকার করতে পারে । নদীর পাড়ে বা নৌঘাটের ইঁদুর দমনে এরা বেশ কার্যকর হতে পারে । এছাড়া বিষহীন কতগুলো সাপ আছে যারা মানুষের কোন ক্ষতি করে না কিন্তু ইঁদুর দমনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে । এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- দারাশ সাপ, ঘর গিন্নি সাপ, দুধরাজ বা তামাটে সাপ, জলঢোড়া সাপ ও মেটে সাপ । এসকল সাপের কোন বিষ নেই, সাধারণত কখনো মানুষকে কামড়ায় না । ইঁদুর দমনে এরা দারুন ভূমিকা রাখতে পারে । প্রতিটি সাপ বছরে কয়েক শত ইঁদুর খায় ।অহেতুক ভয় পেয়ে কেউ যেন এই সাপগুলোকে না মারে সে ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করতে হবে । জলজ প্রাণী ও সাপের সংখ্যা বাড়ানোর উপায় হচ্ছে- পানির দূষণ কমানো, কংক্রিটের পাড় নির্মাণ বন্ধ করা এবং এগুলোকে পিটিয়ে মারা বন্ধ করা ।

 

জীববিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী বেজি (নেউল) হল একটি অত্যন্ত দক্ষ প্রাকৃতিক ইঁদুর শিকারি (Predator) । ইঁদুর ও ইঁদুরের বাচ্চা বেজির অন্যতম প্রধান প্রিয় খাদ্য । গবেষণায় দেখা গেছে কোন এলাকায় বেজির উপস্থিতি ও গন্ধ থাকলে ইঁদুররা ভয়ে সেই এলাকার ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন সেখানে ফিরে আসে না । বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের মত উন্নত শহরেও ইঁদুর দমনে বর্তমানে প্রশিক্ষিত বেজি ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে । বেজি সাধারণত মাটির গর্ত, ঝোপঝাড় ও পুরানো ইটের স্তুপে বাস করে । ঢাকায় বেজির টিকে থাকার পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই । আরেকটা সমস্যা হচ্ছে ইঁদুরের প্রজনন ক্ষমতা বেজির চেয়ে অনেক বেশি । ঢাকায় শুধু বেজির সংখ্যা বাড়ালেই ইঁদুর দমন নাও হতে পারে, ইঁদুরের সংখ্যা অল্প কিছু কমানো যেতে পারে ।

 

বেজির মত শিয়ালও দক্ষ ও অন্যতম প্রাকৃতিক ইঁদুর শিকারি । শিয়ালের খাদ্যাভ্যাসের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ইঁদুর, ছুঁচো এবং মুষিক জাতীয় প্রাণী । শিয়াল চতুর এবং এদের শ্রবণশক্তি অত্যন্ত তীব্র । এরা খুব সহজেই ইঁদুরের নড়াচড়া টের পায় এবং দ্রুত গর্ত খুঁড়ে বা লাফিয়ে ইঁদুর শিকার করতে পারে । তবে শহরাঞ্চলে শিয়ালের বাসস্থানের বড়ই অভাব । খাদ্যের জন্য মানুষের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে । শিয়ালকে তার উপযুক্ত বাসস্থান এবং বিকল্প খাদ্য দিতে হবে । ঢাকায় শিয়াল ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও ফসলের মাঠ ও গ্রামে ইঁদুর মারার জন্য তারা অত্যন্ত কার্যকর।

 

শহরাঞ্চলে পাখি, বেজি, শিয়াল ও অন্যান্য জলজ মাংসাশী প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানোর কাজটি মোটেই সহজ নয় । এজন্য নাগরিক উদ্যোগ, ব্যাপক প্রচারণা এবং বিভিন্ন সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন হবে ।

 

ঢাকা শহরে ইঁদুরের উপদ্রব প্রাকৃতিকভাবে ঘটেনি, মানুষের তৈরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গলদ একে আমন্ত্রণ জানিয়েছে । ঢাকার রাস্তার খোলা ডাস্টবিন এবং গভীর রাত পর্যন্ত এমনকি সকাল পর্যন্ত পচনশীল খাবারের বর্জ্য ফেলে রাখা ইঁদুরের প্রধান ‘ফুড-কোর্ট’ । সিঙ্গাপুর বা টোকিও এর মত শহরে যেখানে রাতারাতি বর্জ্য সিল্ড কনটিনারে সরিয়ে নেয়া হয় সেখানে ঢাকা শহরের বর্জ্য ইঁদুরকে ২৪ ঘন্টা উন্মুক্ত ‘বুফে’ উপহার দিচ্ছে । এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ হচ্ছে সমন্বিত পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (IPM) । এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় খোলা ডাস্টবিন প্রথা বিলুপ্ত করে প্লাস্টিকের সিল্ড ড্রাম ব্যবহার করা হয় । ডাস্টবিনের খাবার খেতে না পারলেই ইঁদুর কমে যাবে । ভবন নির্মাণের সময় মাটির নিচের ড্রেনগুলোতে ‘ওয়ান ওয়ে ক্লাপ ভালভ’ এবং স্টিল ম্যাশ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভবনের বেসমেন্ট ও সংযোগস্থল সিল করার ব্যবস্থা করতে হবে । গুদামঘরে প্যাটেল এবং মেকানিক্যাল ট্রাপ ব্যবহার করতে হবে । ইঁদুর পুদিনা পাতার তীব্র গন্ধ সহ্য করতে পারে না । ঢাকা শহরের পার্ক, বাগান ও বাড়ির আঙিনায় ব্যাপকভাবে পুদিনা পাতা চাষ করা গেলে অন্তত কিছু ইঁদুর ঢাকা শহর থেকে পালাবে ।

 

নিউইয়র্ক সিটি বর্তমানে ইঁদুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে । সনাতন পদ্ধতির পরিহার করে আধুনিক কৌশল বেছে নিয়েছে । স্মার্ট ডাস্টবিন এবং লককরা আবর্জনা বাক্স ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বাইরেও আধুনিক কিছু কৌশল তারা প্রয়োগ করছে । ২০২৫-২০২৬ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে Flaco’s Law এর অধীনে ইঁদুরের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য মিষ্টি স্বাদের বিশেষ গর্ভনিরোধক বড়ি বা তরল টোপ ব্যবহার শুরু করেছে । এতে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় ধরনের ইঁদুরের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে অবিশ্বাস্যভাবে ইঁদুরের জন্মহার কমানো গেছে । এছাড়াও ইঁদুরের গর্ত খুঁজে সেখানে বিশেষ মেশিনের সাহায্যে কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস প্রবেশ করিয়ে মাটির ভেতরের ইঁদুর যন্ত্রণাহীনভাবে দ্রুত মারার কৌশল প্রয়োগ করছে । প্যারিস শহর স্মার্ট ট্রেকিং, সেন্সর বিন, যান্ত্রিক ও গভীর ফাঁদ ব্যবহার ছাড়াও ইঁদুরের সাথে সহঅবস্থান ও অহিংস নীতি গ্রহণ করেছে । ইঁদুর বিলুপ্ত না করে সংখ্যা কামানোর উপর জোর দিচ্ছে, যাতে প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে । লন্ডনে এআই সংযুক্ত থার্মাল ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে ইঁদুরের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় । ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্ট ইলেকট্রনিক ট্র্যাপ (IoT) ব্যবহার করছে ।

 

ইঁদুর একটি ক্ষতিকর ও বিরক্তিকর প্রাণী হলেও প্রকৃতি এবং মানবজাতির কল্যাণে ইঁদুরের ভূমিকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ‌। বিজ্ঞান ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইঁদুরের ভূমিকা অপরিসীম ‌ । আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং বন্য পরিবেশের ভারসাম্য ইঁদুর ছাড়া কল্পনা করা অসম্ভব । মানুষের দীর্ঘায়ু এবং উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ইঁদুরের । গবেষণাগারে ব্যবহৃত মোট প্রাণীর প্রায় ৯৫% ইঁদুর । মানুষের সাথে ইঁদুরের জিনের প্রায় ৯০% থেকে ৯৯% মিল থাকায় ঔষধ এবং টিকা গবেষণায় মানুষের আগে সেগুলোকে প্রথম পরীক্ষা করা হয় ইঁদুরের ওপর । মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অনেক গবেষণায়ও ইঁদুরকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয় । প্রশিক্ষিত ইঁদুরকে ল্যান্ড মাইন ও বোমা সনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করা হয় । কম্বোডিয়ার মাগাওয়া (Magawa) নামের একটি ইঁদুর শতাধিক ল্যান্ডমাইন্ড খুঁজে বের করে রাজকীয় স্বর্ণপদক পেয়েছিল । প্রকৃতিতে ইঁদুর না থাকলে বন্য পরিবেশের পুরো খাদ্যশৃংখল ভেঙে পড়বে । অসংখ্য মাংসাসি পশু-পাখির প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর । ইঁদুর না থাকলে এই প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে ।

মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি, বীজ ছড়ানো ও বানায়নের কাজে ইঁদুর ব্যাপক সহযোগিতা করে । প্রকৃতিতে ইঁদুর থাকতেই হবে , তবে ঢাকা শহরের মত এত অধিক সংখ্যায় নয় । ঢাকা শহর কেবল একটি কংক্রিট, লোহা আর পিছঢালা রাস্তার সমষ্টি নয় । একটি শহর তার মানুষ ও প্রকৃতির সহবস্থানের নাম । ঢাকায় আজ মেট্রোরেল আর এক্সপ্রেসওয়ের যুগে পদার্পণ করেও যদি ইঁদুরের উপদ্রবে জর্জরিত থাকে তবে বুঝতে হবে আমাদের উন্নয়ন একপাক্ষিক । আলবেয়ার কামুর “The Plague ” উপন্যাসের সেই শহরের মতো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই ঢাকাকে বাঁচাতে হবে । বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং প্রাকৃতির হারানো ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে এই র‍্যাট্রোপলিটনকে আবারো মেট্রোপলিটনে হিসাবে পুনর্জন্ম দেয়ার কাজ এখন সময়ের দাবি ।