সততা-প্রতিশ্রুতি-মানবিকতার সংকটে হারাচ্ছে বিশ্বাস
মো. নাসির, নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র) প্রতিনিধি : বর্তমান বিশ্বে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও আধুনিক জীবনের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে, কিন্তু একই সময়ে নৈতিক মূল্যবোধ, সততা ও মানবিকতার চর্চা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্লভ হয়ে পড়েছে।
এক সময় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তার কথার মূল্য। একটি প্রতিশ্রুতি মানেই ছিল বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রয়োজন শেষ হলে অনেক সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়, আর দেওয়া প্রতিশ্রুতিও অনেক সময় ভুলে যাওয়া হয়। এর ফলে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক জীবনে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই নিজের সুবিধা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, অন্যের কষ্ট, সমস্যা বা প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। ফলে কঠিন সময়ে প্রকৃত বন্ধু, বিশ্বস্ত সহকর্মী কিংবা নিঃস্বার্থ সহযোগী খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোষামোদ বা অতি প্রশংসার সংস্কৃতি নিয়েও আলোচনা চলছে। অনেকের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা ও পরিশ্রমের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য তোষামোদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রবণতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সমাজে সঠিক মূল্যবোধের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে কোনো একটি দেশ, জাতি বা জনগোষ্ঠীর সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। প্রতিটি সমাজেই যেমন স্বার্থপর ও অসৎ মানুষ রয়েছে, তেমনি অসংখ্য সৎ, পরিশ্রমী ও মানবিক মানুষও আছেন, যারা কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তারাই সমাজে আশা ও মানবতার আলো জ্বালিয়ে রাখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সততা শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রের একটি গুণ নয়; এটি একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। প্রতিশ্রুতি রক্ষা মানুষের দায়িত্ববোধ ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরিচয় বহন করে। আর মানবিকতা হলো সেই শক্তি, যা মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়।
একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে সততা, পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু একজন সৎ, বিশ্বস্ত ও মানবিক মানুষের মূল্য কখনো কমে না।
বিশ্বাস অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্তেই তা হারিয়ে যেতে পারে। তাই মানবিকতা ও সততার চর্চাই হতে পারে আগামী দিনের সুন্দর সমাজের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।







