ঢাকা | নভেম্বর ২, ২০২৬ - ৯:৪৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

যাদের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিই, অবহেলা আসে অনেক সময় তাদের কাছ থেকেই

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Monday, November 2, 2026 - 2:28 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 3 বার
লেখক: এমডি নাসির  নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র:
জীবনে কিছু মানুষ থাকে, যাদের মুখে হাসি ফোটাতে আমরা নিজের আনন্দটুকুও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করি না। তাদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রাখি, তাদের স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্নকে সরিয়ে দিই। সময়, শ্রম, অর্থ কিংবা জীবনের মূল্যবান মুহূর্ত—সাধ্যমতো সবই উজাড় করে দিই। বিনিময়ে হয়তো বড় কিছু চাই না; চাই একটু আন্তরিকতা, কিছুটা সম্মান আর এই অনুভূতিটুকু যে, তাদের জীবনে আমাদেরও মূল্য আছে।
অথচ কখনো কখনো সেই আপন মানুষদের কাছ থেকেই আসে অবহেলা। যাদের ভালো রাখার চেষ্টায় নিজের ক্লান্তি ভুলে থাকি, তারাই হয়তো আমাদের মনের খবর নেওয়ার সময় পায় না। এই কষ্ট শুধু প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার নয়; এটি আপন বলে ভাবা মানুষের কাছে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়ার বেদনা।
ভালোবাসা যখন একতরফা দায়িত্ব
সম্পর্কে দেওয়া-নেওয়ার হিসাব সব সময় সমান হয় না। জীবনের কোনো পর্যায়ে একজনকে বেশি দায়িত্ব নিতে হয়, অন্যজনের পাশে বেশি সময় থাকতে হয়। অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা মানসিক দুর্দিনে এমন অসম ভার বহন করাও ভালোবাসার অংশ। তাই প্রতিটি অপ্রাপ্তিকে অবহেলা বলা ঠিক নয়।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন একজনের ত্যাগকে অন্যজন স্থায়ী কর্তব্য বলে ধরে নেন। সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা থাকে না, সময় দেওয়ার কোনো স্বীকৃতি মেলে না, এমনকি সামর্থ্যের সীমা জানালেও অভিযোগ শুনতে হয়। তখন সম্পর্ক আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গায় থাকে না; একজন শুধু দিয়ে যান, অন্যজন সেই দেওয়াকে স্বাভাবিক অধিকার মনে করেন।
এমন সম্পর্কে নিজের কষ্ট প্রকাশ করাও কঠিন হয়ে ওঠে। মনে হয়, কথা বললে প্রিয় মানুষটি আঘাত পাবেন কিংবা দূরে সরে যাবেন। সেই ভয়ে আমরা চুপ থাকি। অথচ না-বলা কথাগুলো জমতে জমতে একসময় অভিমান ও দূরত্ব তৈরি করে।
আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়ার নাম ভালোবাসা নয়
মানুষের পাশে দাঁড়ানো সুন্দর একটি গুণ। অন্যের উপকার করতে পারা আনন্দেরও বিষয়। কিন্তু কাউকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলা ভালোবাসার শর্ত হতে পারে না।
নিজেরও বিশ্রাম দরকার, নিজেরও ইচ্ছা আছে, নিজেরও কষ্ট হয়—এই কথাগুলো স্বীকার করা স্বার্থপরতা নয়। সব অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব নয়; সব দায়িত্বও একা বহন করা যায় না। প্রয়োজনে “আজ পারছি না” কিংবা “এভাবে কথা বললে আমার কষ্ট হয়” বলার অধিকার প্রত্যেক মানুষের আছে।
যে সম্পর্ক আন্তরিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে একজনের সীমাবদ্ধতারও স্থান থাকে। শুধু সুবিধা দেওয়ার সময় কাউকে আপন ভাবা, আর তার অসুবিধার সময় মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—এতে সম্পর্কের ভেতরের অসমতাই প্রকাশ পায়।
প্রত্যাশা, অভিমান ও স্পষ্ট কথা
আমরা অনেক সময় মনে করি, প্রিয় মানুষটি না বললেও আমাদের কষ্ট বুঝবেন। কিন্তু মনের কথা সব সময় অন্যের কাছে স্পষ্ট হয় না। তাই অবহেলিত বোধ করলে অভিযোগের ভাষায় নয়, নিজের অনুভূতির কথা সরাসরি বলা জরুরি।
“তুমি কখনো আমার কথা ভাবো না”—এই অভিযোগের বদলে বলা যায়, “প্রয়োজন ছাড়া আমাদের কথা হয় না বলে আমার খারাপ লাগে।” এতে সম্পর্ককে দোষারোপের মধ্যে আটকে না রেখে বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে কথা বলার পরও যদি বারবার একই অসম্মান ফিরে আসে, তখন নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে হয়। সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা মূল্যবান, কিন্তু তার সম্পূর্ণ দায় একজনের নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশা কমানো, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় দূরত্ব রাখার সিদ্ধান্তও নিতে হয়। দূরত্ব মানেই বিদ্বেষ নয়; কখনো তা নিজের শান্তি রক্ষার উপায়।
নিজের জীবনকেও গুরুত্ব দিতে হবে
অন্যের জীবনে আলো জ্বালাতে গিয়ে নিজের জীবন অন্ধকার করে দেওয়া কোনো আদর্শ হতে পারে না। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের জন্য সময় রাখার পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন, কাজ, বিশ্রাম ও আনন্দের জন্যও জায়গা রাখতে হবে।
কেউ আমাদের মূল্য বুঝতে না পারলে তাতে আমাদের মূল্য কমে যায় না। আবার কারও অবহেলার অভিজ্ঞতা থেকে সবাইকে অবিশ্বাস করাও সমাধান নয়। বরং বোঝা দরকার, কোথায় ভালোবাসা আছে, কোথায় কেবল প্রত্যাশার চাপ, আর কোথায় আমাদের উপস্থিতি শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
জীবনে যাদের জন্য অনেক কিছু করি, তাদের কাছ থেকে অবহেলা পেলে কষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। সেই কষ্ট আমাদের নিষ্ঠুর না করুক; বরং নিজের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে শেখাক। মানুষের উপকার করি, ভালোবাসি, বিপদে পাশে দাঁড়াই—তবে ভুলে না যাই, যে মানুষটি সবার জন্য এত কিছু করছে, তারও যত্ন, সম্মান ও ভালো থাকার অধিকার আছে।

Inline image