মজার ছলে অনেকেই বলেন, স্বামী ভালো হয় মৃত্যুর পর! কথাটি শুনতে হাস্যকর হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে দাম্পত্য জীবনের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
একটি সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই প্রত্যাশা থাকে। স্ত্রী চান স্বামী তাঁকে সময় দেবেন, তাঁর কথা শুনবেন, ভালোবাসা প্রকাশ করবেন এবং সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন। অন্যদিকে স্বামীও চান স্ত্রী তাঁকে বুঝবেন, সম্মান করবেন এবং তাঁর পরিশ্রমের মূল্য দেবেন।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন দুজনের প্রত্যাশা একে অপরের কাছে পরিষ্কার থাকে না। স্বামী হয়তো সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। স্ত্রীও সংসার, সন্তান ও নিজের কর্মজীবনের নানা দায়িত্ব সামলে ক্লান্ত থাকেন। কিন্তু দুজনের কেউই যখন অন্যজনের ক্লান্তি বোঝার চেষ্টা করেন না, তখন ছোট বিষয়ও বড় বিরোধে পরিণত হয়।
অনেক সময় স্বামীরা ভালোবাসা প্রকাশ করতে জানেন না। তাঁরা মনে করেন, সংসারের খরচ চালানো, পরিবারের জন্য পরিশ্রম করা এবং দায়িত্ব পালন করাই ভালোবাসার প্রমাণ। কিন্তু স্ত্রী হয়তো চান একটু মিষ্টি কথা, কিছুটা সময়, একসঙ্গে বসে চা পান কিংবা দিনের শেষে তাঁর মনের কথা শোনার একজন মানুষ।
আবার অনেক স্ত্রীও হয়তো স্বামীর নীরব কষ্ট, আর্থিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা কিংবা পরিবারের জন্য তাঁর ত্যাগগুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারেন না।
দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—অনেকে ভালোবাসেন, কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন না। অনেকে ত্যাগ করেন, কিন্তু সেই ত্যাগের স্বীকৃতি পান না। কেউ অভিমান করেন, কেউ চুপ করে থাকেন। এভাবেই দূরত্ব বাড়তে থাকে।
আর যখন স্বামী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন অনেক সময় তাঁর ছোট ছোট অভ্যাস, কথাবার্তা, রাগ, অভিমান এবং উপস্থিতির মূল্য নতুন করে অনুভূত হয়। তখন মনে পড়ে—যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিন ঝগড়া হতো, সেই মানুষটিই জীবনের কত বড় অংশ ছিলেন!
তবে এই অনুভূতি শুধু স্ত্রীর ক্ষেত্রে নয়, স্বামীও স্ত্রীকে হারানোর পর তাঁর শূন্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
আমার ভাবনা হলো, স্বামী ভালো হয় মৃত্যুর পর—এমন কথা যেন বাস্তব জীবনের সত্য না হয়ে থাকে। মানুষকে হারানোর পর নয়, বেঁচে থাকতেই তাঁর মূল্য বুঝতে শিখতে হবে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, সহযোগিতার। কে বেশি ভালো, কে বেশি ত্যাগ করেছেন—তার হিসাব না করে দুজনেরই উচিত একে অপরকে সম্মান করা, ক্ষমা করা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা।
কারণ মৃত্যুর পর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো যায়, কিন্তু জীবিত অবস্থায় একটি সুন্দর কথা, একটু যত্ন, সামান্য সম্মান এবং আন্তরিক ভালোবাসার বিকল্প হয় না।
শেষ কথা: স্বামীকে জীবিত অবস্থায় ভালোবাসুন, স্ত্রীকে জীবিত অবস্থায় সম্মান করুন। সংসারে জয়ী হওয়ার চেয়ে একসঙ্গে সুখী হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।