বাঁশির শেষ সুরে থামল ৩৬ বছরের পথচলা : মাঠকে বিদায় জানালেন রেফারি মাস্টার নাছির আহমদ
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : একটি বাঁশি, একজোড়া বুট আর ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। এই তিনকে সঙ্গী করেই কেটে গেছে জীবনের ৩৬টি বছর। শত শত ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা, হাজারো খেলোয়াড়ের উত্থান-পতনের সাক্ষী হওয়া এবং মাঠে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মানুষটির নাম মাস্টার নাছির আহমদ।
বৃহস্পতিবার ( ১১ জুন ) লোহাগাড়া উপজেলার সদর কর্ণেল অলি আহমদ বীর বিক্রম স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা – ব্রাজিল প্রীতি ম্যাচে প্রথম ১০ মিনিট খেলা পরিচালনা করে অনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর নেন।
দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মাঠ মাতানোর পর এবার অবসরে যাচ্ছেন তিনি। ফলে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে এক আবেগঘন মুহূর্ত।
একসময় যে বাঁশির শব্দে শুরু হতো উত্তেজনাপূর্ণ ফুটবল লড়াই, যে বাঁশির নির্দেশে থেমে যেত বিতর্ক, সেই পরিচিত বাঁশি আর শোনা যাবে না মাঠে। খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও দর্শকদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত মুখ মাস্টার নাছির আহমদ এখন স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নিতে চলেছেন একজন সফল ও সৎ রেফারি হিসেবে।
জানা যায়, ৩৬ বছর আগে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই রেফারিং পেশায় যুক্ত হন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য ফাইনাল ম্যাচ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা এবং স্মরণীয় ক্রীড়া আয়োজন পরিচালনা করেছেন তিনি। মাঠে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ও কঠোর শৃঙ্খলার জন্য খেলোয়াড়দের কাছে যেমন সম্মানিত ছিলেন, তেমনি আয়োজকদের কাছেও ছিলেন আস্থার প্রতীক।
অবসরের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মাস্টার নাছির আহমদ বলেন, “ফুটবল মাঠই ছিল আমার দ্বিতীয় পরিবার। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে মাঠে। অসংখ্য খেলোয়াড়কে বড় হতে দেখেছি, অনেকের সাফল্যের সাক্ষী হয়েছি। আজ যখন অবসরের কথা ভাবি, তখন বুকের ভেতর একটা শূন্যতা কাজ করে। মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে প্রিয় একটি অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠায় এসে দাঁড়িয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “রেফারিং শুধু দায়িত্ব ছিল না, এটা ছিল আমার ভালোবাসা, আমার আবেগ। কখনো ঝড়-বৃষ্টি, কখনো প্রচণ্ড রোদ—সবকিছুকে উপেক্ষা করে মাঠে ছুটে গেছি। কারণ মাঠের ডাক আমি কখনো উপেক্ষা করতে পারিনি। আজ অবসরে যাচ্ছি, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কোনোদিন শেষ হবে না।”
মাস্টার নাছির আহমদ জানান, মাঠে কাটানো অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে রয়েছে আনন্দ, গর্ব ও চ্যালেঞ্জের মুহূর্ত। কখনো দর্শকদের করতালি, কখনো কঠিন সিদ্ধান্তের চাপ—সবকিছু মিলিয়ে ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তরুন ফুটবলার নাফিজ বলেন , ছোটবেলা থেকে মাঠে তাঁকে দেখে বড় হয়েছি। তাঁর বাঁশির শব্দ আমাদের কাছে ফুটবলেরই একটি অংশ ছিল। আজ তিনি অবসরে যাচ্ছেন, এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
লোহাগাড়ার ক্রিড়া সংগঠক ও খেলোয়াড় মোজাফফর আহমদ জানান, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথম পছন্দ ছিলেন মাস্টার নাছির আহমদ। তাঁর অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতা খেলার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত। তাঁর অবসর আমাদের জন্য সত্যিই আবেগের একটি মুহূর্ত।তাঁর অবসরে শুধু একজন রেফারি নয়, মাঠ হারাচ্ছে একজন অভিভাবককে।”
লোহাগাড়া উপজেলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ক্রীড়া সংগঠক এস এম চিশতী বলেন, “মাস্টার নাছির আহমেদ স্যার একজন নিঃস্বার্থ ক্রীড়াপ্রেমী ও ক্রীড়াঙ্গনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষ।
আমি যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন থেকেই মাঠে তাঁর বাঁশির সুর, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা দেখে বড় হয়েছি। একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তিনি সবসময় আমার পাশে ছিলেন, পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে পথ দেখিয়েছেন। আজও তাঁর সেই সহযোগিতা ও স্নেহ আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।
তাঁর শেষ বাঁশিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা সকলের পক্ষ থেকে এই বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করেছি। তবে এটি বিদায় নয়, বরং তাঁর দীর্ঘ ক্রীড়া জীবনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ। আমরা বিশ্বাস করি, মাঠে রেফারির দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেও তিনি ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন এবং আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে আগের মতোই সক্রিয় ভূমিকা রেখে যাবেন।”
সাবেক খেলোয়াড় জিয়াউর রহমান জানান ,
“৩৬ বছর ধরে তিনি যেভাবে খেলাধুলার সেবা করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর অবসর জীবনের জন্য শুভকামনা রইল। তবে মাঠে তাঁর অভাব আমরা সবসময় অনুভব করব।”
দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ও সহকর্মী রেফারি নাছির উদ্দিন বলেন, “মাস্টার নাছির আহমদ শুধু একজন দক্ষ রেফারিই নন, তিনি মাঠের শৃঙ্খলা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে তিনি নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, আন্তরিকতা এবং খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা নতুন প্রজন্মের রেফারিদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মাঠে তাঁর বাঁশির সুর আর শোনা না গেলেও ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
লোহাগাড়া ক্রিড়া সংস্থার সদস্য সচিব কুতু্ব উদ্দিন বলেন, মাস্টার নাছির আহমদের মতো নিবেদিতপ্রাণ রেফারি খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু খেলা পরিচালনা করেননি, বরং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
অবসরের এই ক্ষণে অনেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়াপ্রেমী স্মরণ করছেন তাঁর অবদান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন অনেকে। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের বিশ্বাস, মাঠে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও তাঁর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও অবদান আগামী দিনের ফুটবলকে পথ দেখাবে।
৩৬ বছরের দীর্ঘ পথচলার শেষে হয়তো আর দেখা যাবে না রেফারি মাস্টার নাছির আহমদকে বাঁশি হাতে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। আর শোনা যাবে না তাঁর সেই পরিচিত বাঁশির ধ্বনি। তবে স্থানীয় ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। কারণ কিছু মানুষ অবসরে যান, কিন্তু তাঁদের অবদান কখনো অবসর নেয় না। মাস্টার নাছির আহমদ তেমনই এক নাম।








