ঢাকা | জুন ৩০, ২০২৬ - ৫:৪১ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

“পরশ্রীকাতরতার ‘জাদুবাস্তবতা’এবং শহীদুল জহির বিতর্ক”—অধ্যাপক মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Tuesday, June 30, 2026 - 10:33 am
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 34 বার
সম্প্রতি আমাদের একজন খুবই স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী এক সাক্ষাৎকারে শহীদুল জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণীর লেখকও মনে করেন না’ বলে যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে চারিদিকে তুমুল ঝড় উঠেছে । কিন্তু এই বিতর্ককে কেবল এক লাইনের ট্রল বা অন্ধ সমালোচনা হিসেবে না দেখে যদি আমরা সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জ্যাক লাকা এবং আহমদ ছফার মননশীলতার আলোয় দেখি-  তবে এর পেছনে এক আদিম ও  অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক খেলা দেখতে পাওয়া যায় ।
 সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো শহীদুল জহির নিজেই তার গল্প-উপন্যাসে বাঙালির এই পরশ্রীকাতরতা বা সমষ্টিক ঈর্ষাকে নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করে গেছেন । “সে রাতে পূর্ণিমা ছিল” উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের অভাবনীয় ‘শ্রী’ বা বৈভব দেখে পুরো সুহাসপুর গ্রামের মানুষ যেভাবে ফিসফিসানি, কুৎসা আর গুজবের কুয়াশা তৈরি করেছিল, তা ছিল বাঙালির চিরন্তন মানসিকতার এক রূপ । জহির দেখিয়েছেন, সমাজ যখন অন্যের ভাষার সার্বভৌমত্ব, মেধা বা প্রেম সহ্য করতে পারে না, তখন সে সেই সফল মানুষকে টেনে নিচে নামানোর জন্য সমষ্টিক হিংস্রতার আশ্রয় নেয় । আজ যখন জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলে খারিজ করা হয়, তখন ইতিহাস যেন জহিরের সেই উপন্যাসের পাতা থেকেই বাস্তবে ফিরে আসে ।
বাঙালির– বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের এই মনস্তত্ত্বকে সবচেয়ে নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন আহমদ ছফা । তাঁর কালজয়ী ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন:
    “বাঙালি মুসলমানের সমাজটি একটি আত্মকেন্দ্রিক সমাজ । ইহার চোখ বাইরের দিকে অবারিত নহে, নিজের চারিদিকেই ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে । এই সমাজের মানুষ কোন মহৎ সৃষ্টিতে আনন্দ পায় না, কিন্তু অন্যের পতনে একপ্রকার বিকৃত তৃপ্তি অনুভব করে।  নিজেরা বড় হতে পারে না বলিয়া, অন্য কেহ বড় হইলে তাহাকে টিনিয়া নিচে নামাইবার এক সর্বগ্রাসী  বাসনা এই সমাজকে তাড়াইয়া ফেরে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন জহিরের মত একজন নিভৃতচারী মৌলিক রূপকারকে এভাবে খারিজ করে দেন, তখন ছফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’- এর সেই অমোঘ বাক্যটি সত্য হয়ে দাঁড়ায়:     “আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা আসলে সুবিধাবাদী এবং পরনিন্দুক ‌।  নিজেরা কোন নতুন সত্য আবিষ্কার করিতে পারেন না,  অথচ অন্য কেহ সত্য বলিলে বা সৃষ্টিশীল কিছু করিলে তাহা সহ্য করিবার ক্ষমতাও তাহাদের নেই।”
ফ্রয়েডের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব আছে-  ‘নার্সিসিজম অফ স্মল ডিফারেন্সেস’ বা ক্ষুদ্র পার্থক্যের অহমিকা । যখন দুটি সমগোত্রীয় সত্তা কাছাকাছি থাকে (যেমন দুজনেই যদি ফরাসি তত্ত্ব, নিম্নবর্গীয় ইতিহাস, ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তা ও মনোনানশীলতা নিয়ে কাজ করেন), তখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে অপরপক্ষকে তীব্র আক্রমণ করার এক অবচেতন তাড়না তৈরি হয় । জহির যখন তাঁর ‘জাদুবাস্তব’ গদ্যে পাঠকদের মগজ জয় করে নেন, তখন তাত্ত্বিক জগতের সমকক্ষতার কারণে হয়তো কোন বুদ্ধিজীবীর অবচেতন অহং (Ego) আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ফ্রয়েডীয় ‘প্রজেকশন’ তত্ত্ব বলে-  ব্যক্তি যখন নিজের ভেতরের কোন সুপ্ত খামতি (যেমন মৌলিক সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির অভাব) সরাসরি মেনে নিতে পারে না,  তখন সে অন্যের সেই অসামান্য সৃজনশীলতাকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলে খাটো করে নিজের মনকে শান্ত করতে চায়  ।
জ্যাক লাকা আবার মনে করতেন মানুষের আকাঙ্ক্ষা সব সময় অন্যের আকাঙ্খাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় । লাকার ভাষায়, পরশ্রীকাতর ব্যক্তি  মূলত অন্য ব্যক্তির ‘প্রাপ্তি’ দেখে কাতর হয় না,  সে কাতর হয় অন্যের পরম আনন্দ বা jouissance দেখে । শহীদুল জহির তাঁর দীর্ঘ ও গোলকধাঁধময় গদ্যে ভাষার যে সার্বভৌমত্ব ও নান্দনিক আনন্দ তৈরি করেছেন, তা অনেক বুদ্ধিজীবীর অতি-তাত্বিক ও উদ্ধৃতি নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার বলয়কে এক মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় । তাই জহিরকে সম্পূর্ণ খারিজ ( Foreclosure) করে দিয়ে তাঁরা মূলত সাহিত্য বিচারের সর্বোচ্চ মাপকাঠি এবং শেষ কথাটি বলার চাবিকাঠি-  অর্থাৎ ‘পরম অন্যের দৃষ্টি’ ( The Gaze of the Big Other) নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান।
শহিদুল জহিরের উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের ট্রাজেডির পর যেমন গ্রামের মানুষের মনে এক বিকৃত সাময়িক স্বস্তি  নেমে এসেছিল,জহিরকে তৃতীয় শ্রেণীর লেখক বলে চাবুক মারার ভেতরেও কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও তাঁদের অন্ধ অনুসারীদের অবচেতন মন ঠিক একই ধরনের পঙ্কিল তৃপ্তি পেতে চাইছে । কিন্তু দিনশেষে আহমেদ ছফার আরেকটি অমোঘ  বাক্যেই চিরন্তন সত্য, ” বাঙালি চরিত্রের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো সে গুণীর কদর করিতে জানেনা, কিন্তু গুণী মরিয়া গেলে তার শ্রাদ্ধ করিতে ভালোবাসে ।”  তাত্ত্বিক ফতোয়া দিয়ে শহিদুল জহিরের সেই জাদুকরি গদ্যকে পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব । জহিরের সাহিত্য তাঁর নিজের ‘শ্রী’ বা মহিমায় উজ্জ্বল থাকবে ।