ঢাকা | আগস্ট ২৪, ২০২৬ - ৯:৪০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও সরকারি বিদ্যালয় নেই কাপ্তাইয়ের দুর্গম শুভধন পাড়ায়

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Monday, August 24, 2026 - 2:40 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 9 বার

মিন্টু কান্তি নাথ রাজস্থলীঃচারদিকে উঁচু পাহাড় আর ঘন অরণ্য। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে কাপ্তাই লেক ধরে প্রায় দুই ঘণ্টার নৌপথ। এরপর আরও প্রায় দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরোতে হয়। তবেই দেখা মেলে শুভধন পাড়ার। যেটা রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী উপজেলার সীমান্তবর্তী কাপ্তাই উপজেলার ৪ নং কাপ্তাই ইউনিয়ন এর ১ নং ওয়ার্ডের ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজায় অবস্থিত। এই জনপদে স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি বিদ্যালয়। পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলোও।

যোগাযোগব্যবস্থার চরম প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের কারণে এখানকার অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৭০ জন শিশু পড়াশোনা করছে। আশপাশের সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। কানাডাপ্রবাসী প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কাপ্রবাসী বিপসসি ভান্তে, কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ কয়েকজন শিক্ষানুরাগীর সহায়তায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, “শুধু দুর্গমতার কারণে এই এলাকার শিশুরা যেন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই তাগিদ থেকেই স্কুলটি গড়ার উদ্যোগ নিই। শিশুরা অনেক কষ্ট করে এখানে পড়তে আসে। আমাদের স্বপ্ন, এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা।”
স্থানীয় কারবারি দীন মোহন তনচংগ্যা বলেন, আগে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠানো প্রায় অসম্ভব ছিল। পাড়ার কাছেই বিদ্যালয় হওয়ায় এখন ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে বিদ্যালয়টি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। কোনো বেতন ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান করছেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও কোনো বেতন নেওয়া হয় না। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাগরিকা তনচংগ্যা
বলেন, “শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু এভাবে দীর্ঘদিন চালানো কঠিন। স্কুলটির জন্য সরকারি সহযোগিতা ও স্থায়ী ব্যবস্থা জরুরি।”

স্কুলের শিক্ষার্থী জোনাকি তনচংগ্যা ও সুশান্ত চাকমা বলেন, আমাদের স্কুলটি সরকারি হলে আমরা অনেক সুযোগ সুবিধা পেতাম।

স্থানীয়দের দাবি বিদ্যালয়টি দ্রুত সরকারি স্বীকৃতি ও জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক। সরকারি স্বীকৃতি পেলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিনা বেতনে কাজ করা শিক্ষকেরা আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন ।

কাপ্তাই উপজেলার ৪ নম্বর কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, “বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি পাক—এটাই আমাদের কামনা। এর ফলে দুর্গম এলাকার দরিদ্র শিশুরা শিক্ষার সুযোগ পেয়ে আরও এগিয়ে যাবে।”

বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য সংশ্লিষ্টরা কিছু কাগজপত্র পাঠিয়েছিলেন। সেগুলো আমি রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছি। তবে কিছু কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় আবেদনটি ফেরত এসেছে। প্রয়োজনীয় ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে আবেদন করতে হবে।”

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শুভধন পাড়ার বিদ্যালয়টি এখন দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন দুর্গম পথ পেরিয়ে বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ছুটে আসে শিশুরা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি স্বীকৃতি ও জাতীয়করণ করা হলে পাহাড়ের এই প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষার আলো আরও বিস্তৃত হবে এবং বদলে যাবে পিছিয়ে থাকা বহু শিশুর ভবিষ্যৎ।