প্রচ্ছদ » » সন্তানের অপরাধে অভিভাবকের দায়বদ্ধতা: ইংল্যান্ড-ওয়েলসের প্রস্তাব, বাংলাদেশের জন্যও ভাবনার বিষয়
সন্তানের অপরাধে অভিভাবকের দায়বদ্ধতা: ইংল্যান্ড-ওয়েলসের প্রস্তাব, বাংলাদেশের জন্যও ভাবনার বিষয়
- দৈনিক নবোদয় ডট কম
- আপডেট: Monday, September 21, 2026 - 12:24 pm
- News Editor
- পঠিত হয়েছে: 13 বার
তবে প্রস্তাবটির মূল উদ্দেশ্য শুধু অভিভাবকদের শাস্তি দেওয়া নয়। সন্তানদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে বাবা-মাকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্বশীল করা এবং সন্তানের আচরণ সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
এই আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ হয়ে মারামারি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে কি শুধু কিশোর গ্যাং? নাকি সমাজের নানা স্তরে তৈরি হওয়া একটি বৃহত্তর ‘গ্যাং সংস্কৃতি’ এর পেছনে কাজ করছে?
কিশোররা শূন্য থেকে অপরাধের সংস্কৃতি শেখে না। পরিবার, বন্ধু, স্কুল, সামাজিক পরিবেশ এবং বড়দের আচরণ তাদের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি তাদের অপরাধে যুক্ত হওয়ার পেছনের কারণগুলোও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার পরিবার বিষয়টি জানত কি না, অভিভাবকরা সন্তানের চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন এবং তারা প্রয়োজনীয় তদারকি করেছিলেন কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে অবশ্যই এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রয়োজন। সন্তানের অপরাধের জন্য কোনো অভিভাবককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়ী করা ন্যায়সংগত হবে না। তবে প্রমাণিত অবহেলা, অপরাধে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বা আইনগত নির্দেশ অমান্যের মতো বিষয় থাকলে অভিভাবকের দায়িত্বের প্রশ্নটি আইনগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কিশোরদের ব্যবহার করে যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা সংগঠিত চক্র অপরাধ পরিচালনা করে, তাহলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অভিভাবক কাউন্সেলিং, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ, মাদকবিরোধী কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমাজের বড়দের আচরণেও দায়িত্বশীলতার উদাহরণ তৈরি করা। একজন কিশোরকে সহিংসতা ও অপরাধ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া হলেও সে যদি চারপাশে ভয় দেখানো, দখলদারি, চাঁদাবাজি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি দেখতে পায়, তাহলে সেই নেতিবাচক পরিবেশ তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। অপরাধে জড়িত কিশোরকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাকে অপরাধে ঠেলে দেওয়া পরিবেশ, প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংগঠিত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের প্রস্তাবটি বাংলাদেশে হুবহু প্রয়োগ করার বিষয় নয়; বরং এটি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সন্তানকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজ কতটা নেবে?
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পুলিশি অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ কিশোর অপরাধ দমন শুধু আজকের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়—এটি আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষারও প্রশ্ন।
আরও পড়ুনঃ
সর্বশেষ আপডেট








