ঢাকা | মার্চ ১২, ২০২৬ - ২:৫৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

ক্রোধ -বিচিত্র কুমার

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Wednesday, August 6, 2025 - 6:26 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 121 বার

মানুষের মনের গভীরে একটি আগ্নেয়গিরি থাকে, যেটি কখনো সুপ্ত, কখনো অগ্ন্যুৎপাতের অপেক্ষায় থাকে। সেই আগ্নেয়গিরির নাম—ক্রোধ। এটি মানুষের জন্মগত স্বভাবের অংশ, যা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আচরণের উপর প্রভাব ফেলে। তবে, মানুষই একমাত্র জীব, যে তার ক্রোধকে চিন্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—যদি সে চায়। অথচ, এই চাওয়াটাই অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। ফলে, ক্ষণিকের উত্তেজনা থেকে জন্ম নেয় এমন সব ঘটনা, যা ব্যক্তিজীবন, সমাজ এবং সম্পর্কের উপর গভীর আঁচড় কেটে যায়।

বাস্তব জীবনের দিকে তাকালেই দেখা যায়, প্রতিদিন কত মানুষ কত তুচ্ছ কারণে নিজেদের শান্ত জীবনকে অশান্ত করে তোলে শুধু মাত্র ক্রোধের বশবর্তী হয়ে। একবারের জন্যও তারা ভাবেনা—এই মুহূর্তের রাগটা যদি আমি সামলে রাখতাম, তাহলে হয়তো ফলাফল এতটা ভয়াবহ হতো না।

একটি শহরের গল্প বলি। বাসে ওঠা নিয়ে দুই যুবকের মধ্যে সামান্য ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল। একজন বলেছিল, “সাবধানে ওঠেন,” আরেকজন বলেছিল, “তুমি কে আমাকে শেখানোর?” সেখান থেকে বাক-বিতণ্ডা, হাতাহাতি, এবং শেষে পুলিশি ঝামেলা পর্যন্ত গড়ায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি আসলেই প্রয়োজন ছিল? শুধু মাত্র “ক্রোধ” নামক অগ্নিশিখার সংস্পর্শে এসে দু’জন মানুষ তাদের সারাদিনের শান্তি হারাল, আইনি হয়রানি বাড়াল এবং নিজেদের মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট করল।

ক্রোধের মধ্যে একধরনের “আমি”-এর অহংকার মিশে থাকে। মানুষ ভাবে, “আমি যদি চুপ থাকি, তাহলে দুর্বল মনে করবে,” কিংবা “আমার কথা শেষ কথা হতে হবে।” অথচ প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে জানে কখন চুপ থেকে পরিস্থিতিকে শান্ত করতে হয়। আমাদের সমাজে ধৈর্যশীল মানুষের সংখ্যা দিনদিন কমছে। সবাই চায় প্রতিটি বিষয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে, অথচ কেউ বুঝতে চায় না, শ্রেষ্ঠত্ব কখনো “চিৎকার” বা “রাগ” দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

একজন মা যখন রাগে নিজের সন্তানকে মারধর করেন, তখন তিনি মনে করেন এটা শুধুই শাসন। কিন্তু শিশুর কোমল মনে সেই মুহূর্তের ভয় ও অপমান গভীরভাবে গেঁথে যায়। পরে সেই সন্তানই হয়তো অন্যের উপর তার সেই জমে থাকা ক্রোধ উগড়ে দেয়। এরকম হাজারো চক্র আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কারো কাছে “শান্তির পাঠ” শেখে না, বরং রাগের চক্রাকারে বেড়ে চলেছে হিংসা, বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসার আগুন।

ক্রোধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, এটি “চিন্তাশক্তি” কে মুহূর্তেই গ্রাস করে নেয়। রাগান্বিত অবস্থায় মানুষ তার বিবেক-বিবেচনাকে ভুলে গিয়ে এমন সব কাজ করে ফেলে, যার জন্য সারাজীবন অনুশোচনায় পুড়তে হয়।

একজন ব্যবসায়ীর কথা বলি, যিনি ক্রমাগত প্রতিযোগিতার চাপে থাকেন। একদিন অফিসের একজন কর্মচারীর সামান্য ভুলে তিনি এতটাই রেগে যান যে, প্রকাশ্যে সেই কর্মচারীকে অপমান করে বসেন। অথচ পরদিনই তিনি জানতে পারেন যে, সেই কর্মচারীর মা হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি, আর সেই কারণেই ছেলেটির মনোযোগ ছিলো না। তখন নিজের ব্যবহারের জন্য তিনি লজ্জিত বোধ করেন। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র ব্যবসায়ীর নয়, বরং আমাদের সকলের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

ক্রোধ, একদিকে যেমন মানুষের আবেগপ্রবণতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তা কখনো কখনো ন্যায়বিচারের দাবিতেও পরিণত হয়। তবে এই ন্যায়বিচার তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা নিয়ন্ত্রিত আবেগ ও যুক্তিবোধের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। গুটিকয়েক মুহূর্তের অন্ধ ক্রোধ যেমন ধ্বংস ডেকে আনে, তেমনি দীর্ঘদিনের সহ্য করার পর একটি সঠিক মুহূর্তে যুক্তির সাথে প্রকাশিত ক্রোধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদে পরিণত হতে পারে।

ক্রোধকে দমন করার কৌশল সকলেই জানে—শুধু প্রয়োগ করার মানসিকতা নেই। রাগের মুহূর্তে পাঁচ মিনিট চুপ থাকা, কয়েকবার গভীর শ্বাস নেওয়া, অথবা একটু হাঁটতে বেরিয়ে আসা—এই সাধারণ বিষয়গুলোই অনেক বড়ো দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে পারে। অথচ মানুষ তখন ভাবে, “এখনই প্রতিক্রিয়া না দিলে আমি দুর্বল হয়ে যাবো।”

ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও ক্রোধ ভয়ঙ্কর ফাটল ধরিয়ে দেয়। সামান্য তর্কাতর্কির মধ্যেও যখন অহংকার ও উত্তেজনা জড়িয়ে যায়, তখন সম্পর্কের মাধুর্য আর স্থায়িত্ব বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলে মানুষ। “তুমি কেন বললে?” — এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই শুরু হয় একেকটি সম্পর্কের মৃত্যু।

আরেকটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করা যায়। একটি গ্রামে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। একদিন কথা কাটাকাটি চলাকালে একপক্ষের একজন লোক আরেকজনকে ধাক্কা মারে। অপর পক্ষ রাগে উত্তেজিত হয়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রাণহানিতে গড়ায়। অথচ তারা যদি প্রথমে নিজেদের ক্রোধকে সামলাতে পারত, বিষয়টি হয়তো কথাবার্তায় মীমাংসা হয়ে যেত। এই এক মুহূর্তের ক্রোধই কত পরিবারকে শোকগ্রস্ত করে দেয়, কত জীবন ধ্বংস করে দেয়—তার হিসাব কেউ রাখে না।

অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন দক্ষ ম্যানেজার তার অধীনস্থ কর্মচারীদের প্রতি ধৈর্যশীল আচরণ করলেই কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বেড়ে যায়। অথচ কেউ যদি বারংবার চিৎকার-চেঁচামেচি করে, তাহলে কর্মীরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এটা গবেষণাতেও প্রমাণিত যে, “রাগের পরিবেশ” কর্মস্থলে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ করে তোলে।

ক্রোধের ভিন্নতর দিক হলো “নীরব ক্রোধ”—যেটি মুখে প্রকাশ পায় না, বরং অন্তরে জমতে জমতে এক সময় বিষের মতো বিস্ফোরিত হয়। অনেক সময় মানুষ মুখে কিছু বলে না, কিন্তু মনে মনে অপমানের ক্ষত বহন করে চলে। এটি আরও ভয়ানক কারণ, বাহ্যিক প্রকাশ না পাওয়ায় এই ক্রোধকে উপশম করার সুযোগ থাকে না, ফলে তা দগ্ধ হতে হতে ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

আমাদের চারপাশে যারা প্রতিনিয়ত হাসিমুখে ঘোরে, তাদের অনেকেই হয়তো ভিতরে ভিতরে নীরব ক্রোধে জ্বলছে। এই নীরব ক্রোধই কখনো কখনো আত্মহনন, মানসিক রোগ এবং সম্পর্কবিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেয়।

তবে ক্রোধকে পুরোপুরি নিঃশেষ করা যায় না। বরং একে পরিশীলিত ও নিয়ন্ত্রিত করা যায়। যেভাবে নদীর জল যদি বাঁধে না আটকে দেওয়া হয়, তাহলে তা ভাসিয়ে নিয়ে যায় চারপাশ, তেমনি ক্রোধও যদি সীমার মধ্যে রাখা যায়, তবে তা অনেক সময় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, সমাজের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই—সবক্ষেত্রেই ক্রোধের প্রয়োজন আছে। তবে সেই ক্রোধ হতে হবে যুক্তিবোধ সম্পন্ন এবং আত্মনিয়ন্ত্রিত।

একজন সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ কখনোই রাগকে তার চিন্তাশক্তির উপর চড়তে দেয় না। সে জানে, কখন নিজের আবেগ প্রকাশ করতে হয়, কখন চুপ থেকে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

ক্রোধের প্রতিকার শুধুমাত্র “জ্ঞান” এবং “সচেতনতা”-এর মাধ্যমে সম্ভব। একজন ব্যক্তি যদি প্রতিদিন নিজের উপর অন্তত দশ মিনিট সময় দেয়, নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে সে তার ক্রোধকেও সহজেই বুঝে উঠতে পারে। মনোবিদরা বলেন, প্রতিদিন ধ্যান করার মাধ্যমে মানুষের রাগের মাত্রা অনেকটাই কমানো যায়। তবে এই চেষ্টা করতে হয় নিজের জন্য, অন্যের জন্য নয়।

ক্রোধ একটি শক্তি—যদি তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে তা সৃষ্টি করে নেতৃত্বের ক্ষমতা; আর যদি তা নিজের উপর চড়ে বসে, তবে তা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনে বহু সফল মানুষের গল্পেও দেখা যায়, তারাও রাগ করতেন, কিন্তু তারা জানতেন কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই রাগ প্রকাশ করতে হবে। আর যারা এই শিখরে পৌঁছাতে পারেনি, তাদের অনেকেই ক্ষণিকের রাগে জীবনের অনেক বড়ো সুযোগ হারিয়েছেন।

সমাজে আমরা যদি ক্রোধের প্রতি সজাগ হই, নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শিখি, তাহলে হয়তো অনেক অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব, হিংসা, বিচারহীন ঘটনা কমিয়ে আনতে পারব। প্রত্যেক মানুষের মনে থাকা ক্রোধের আগুনকে যদি জ্ঞানের শীতলতায় প্রশমিত করা যায়, তাহলে সমাজ হবে আরো সহনশীল, আরো মানবিক।