কোনো মানুষই অবৈধ নয়”: বৈধতার দাবিতে সিউলে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ঐতিহাসিক ‘ওচেতুজি’ পদযাত্রা।
সালেহ আহম্মদ, দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিনিধি: সিউল: দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত অনথিভুক্ত বা ভিসাবিহীন (Undocumented) অভিবাসী শ্রমিকদের বৈধভাবে বসবাসের অধিকার ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে রাজধানী সিউলে এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়স্পর্শী প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তীব্র দাবদাহ ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে শত শত প্রবাসী শ্রমিক এবং কোরিয়ান মানবাধিকারকর্মী এই ঐতিহাসিক ‘ওচেতুজি’ (পূর্ণাঙ্গ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম) পদযাত্রায় অংশ নেন।
আজ ১৪ জুন (রবিবার) দুপুর ২টায় সিউলের কেন্দ্রস্থল গুয়াংহওয়ামুন সরকারি কমপ্লেক্স (Government Complex Seoul) ভবনের সামনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসী নেতারা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশি শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমরা কেবল শ্রম দিতে আসিনি, সম্মান ও অধিকার নিয়ে বাঁচতেও এসেছি। অভিবাসী শ্রমিকদের ঘামেই আজ কোরিয়ার বহু শিল্পখাত সচল। তাই আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য।”
সংবাদ সম্মেলন শেষে শুরু হয় কর্মসূচির মূল আকর্ষণ—ঐতিহাসিক ‘ওচেতুজি’ পদযাত্রা। ‘ওচেতুজি’ একটি ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য প্রতিবাদী কর্মসূচি, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা প্রতি দুই-তিন কদম পরপর সম্পূর্ণ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে মাটিতে শুয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন। গুয়াংহওয়ামুন সরকারি কমপ্লেক্স থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ব্লু হাউস (Cheong Wa Dae) অভিমুখে এগিয়ে যায়। রাজপথে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে পড়ে অভিবাসীদের এই আত্মত্যাগ ও প্রতিবাদের দৃশ্য স্থানীয় পথচারী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আন্দোলনকারীদের ৫ দফা :
১. কর্মস্থল পরিবর্তনের পূর্ণ স্বাধীনতা: মুক্তভাবে কর্মস্থল পরিবর্তনের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২. বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা:
বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ এবং কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্য বন্ধ করতে হবে।
৩. মানবাধিকার সুরক্ষা: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড অনুসারে অভিবাসী শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বাসযোগ্য আবাসন ব্যবস্থা: অমানবিক কন্টেইনার বা নিম্নমানের আবাসনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য আবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ধরপাকড় বন্ধ ও সাধারণ ক্ষমা:
ভিসাবিহীন বা অনথিভুক্ত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর পরিচালিত ক্র্যাকডাউন ও ধরপাকড় অবিলম্বে বন্ধ করে তাদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
সমাবেশ ও পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা জানান, কঠোর ভিসানীতি এবং কর্মস্থল পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে অনথিভুক্ত অবস্থায় চলে যান। এটি তাদের ইচ্ছাকৃত অপরাধ নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার ফল। রাজপথে শুয়ে এই নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদের মাধ্যমে তারা কোরিয়া সরকার ও সাধারণ জনগণের বিবেকের কাছে ন্যায্য বিচারের আবেদন জানিয়েছেন।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আন্দোলন একদিনের নয়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।








