জেদ্দা কনস্যুলেটে শ্রম বিষয়ক মুক্ত আলোচনা: প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস
জেদ্দা (সৌদি আরব), : সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা, অধিকার, দায়িত্ব ও করণীয় বিষয়ে সচেতন করতে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের উদ্যোগে শ্রম বিষয়ক মুক্ত আলোচনা ও ‘আমার জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের বিভিন্ন অভিযোগ, শ্রম সংক্রান্ত জটিলতা ও আইনি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি সৌদি আরবের আইন-কানুন মেনে চলা, কর্মক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রতারণা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে শ্রম কাউন্সিলর খন্দকার সিরাজুস সালেকীন বলেন, সৌদি আরবের আইনকে সম্মান করে প্রবাসীদের নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, প্রবাসীদের যেকোনো যৌক্তিক সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় এবং তা সমাধানে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে আসার আগে নিয়োগকর্তার সঙ্গে সম্পাদিত কর্মী চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে বুঝে আসতে হবে। চুক্তির কপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে। নিয়োগকর্তা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ বা সুযোগ-সুবিধা না দিলে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে।
শ্রম কাউন্সিলর আরও জানান, যেসব প্রবাসীর ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং যারা দেশে ফিরতে চান, তাদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এছাড়া কফিল থেকে পালিয়ে যাওয়া (হুরুব) বা অবৈধ অবস্থায় থাকা প্রবাসীদের সৌদি আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। তিনি বলেন, প্রবাসীদের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সৌদি পুলিশ কিছু প্রবাসীকে আটক করছে, কারণ অনেক কর্মী তাদের নির্ধারিত কর্মস্থল বা এলাকার বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং সমস্যা সমাধানে কনস্যুলেট কাজ করে যাচ্ছে।
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
আলোচনায় প্রবাসী কর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
নিজের ইকামা ব্যবহার করে অন্য কারও জন্য কোনো পণ্য ক্রয় বা আর্থিক লেনদেন না করা।
সাদা কাগজে কখনো আঙুলের ছাপ বা স্বাক্ষর না দেওয়া।
নিজের সব পাওনা অগ্রিম বুঝে পেয়েছেন—এমন কোনো কাগজ প্রকৃত পাওনা গ্রহণের আগে স্বাক্ষর না করা।
চাকরির চুক্তিপত্র, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্য ও অন্যান্য আইনি নথি ভালোভাবে পড়ে বুঝে তারপর স্বাক্ষর করা।
যেকোনো সন্দেহজনক বা প্রতারণামূলক প্রস্তাব থেকে সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া।
কর্মকর্তারা বলেন, প্রবাসীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে অনেক ধরনের হয়রানি ও প্রতারণা এড়ানো সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রবাসীরা সৌদি আরবের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষিত ও কর্মদক্ষ শ্রমিক পাঠানো হলে সৌদি আরবে কাজের সুযোগের অভাব নেই। দেশটির বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প ও সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তাই কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সৌদি আরবে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
এ সময় এক প্রবাসী কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছেই তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ ৯ মাস কাজ করেও কোনো বেতন পাননি, বরং তাকে জেলেও যেতে হয়েছে। ন্যায়বিচারের আশায় তিনি কনস্যুলেটে আসেন। তার অভিযোগ শুনে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে কাউন্সিলর কনসাল এস এম সায়েম প্রবাসীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সৌদি আরবের আইনবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। সৌদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে প্রবাসীদের সহযোগিতা করা আরও সহজ হবে।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে কনস্যুলেট সবসময় সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল জেদ্দার কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন প্রবাসীদের স্বাগত বক্তব্যে সৌদি আরবের আইন-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল সবসময় পাশে রয়েছে। প্রবাসীদের যেকোনো যৌক্তিক সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কমার্শিয়াল কাউন্সিলর ও কার্যালয় প্রধান সৈয়দা নাহিদা হাবিবা, কাউন্সিলর এস এম সায়েম, কাউন্সিলর পাসপোর্ট মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, প্রথম সচিব শ্রম নাজমুল হাসান, সোনালী ব্যাংকের এজিএম জহিরুল ইসলামসহ কনস্যুলেটের বিভিন্ন কর্মকর্তা।
এছাড়া সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা, শ্রম সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং সৌদি আরবে নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








