সন্তানের লেখাপড়া ও শিক্ষার মানের অগ্রগতি ধরে রাখতেই বদলী স্থগিতের দাবী নানা মহলে
স্টাফ রিপোর্টারঃময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার হঠাৎ বদলী নিয়ে নানা মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা ঝড় দেখা দিয়েছে। একমাত্র সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধা ও ময়মনসিংহ সদরের প্রাথমিক শিক্ষার মানের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের বদলীর আদেশ স্থগিতের দাবী জানিয়েছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন পেশাশ্রেণীর ব্যক্তিবর্গরা।
অবশ্য এসএসসি পরীক্ষার্থী একমাত্র সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধার্থে মনিকা পারভীনের,সদরেই থাকার আবেদন করলে তার আবেদন পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করায় সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ।
একজন সরকারি কর্মকর্তার বদলি প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই বদলি যখন একই শহরে কর্মরত স্বামী-স্ত্রীর একজনকে অন্য উপজেলায় নিয়ে যায়, আর তাঁদের একমাত্র সন্তান তখন গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে—তখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয় মানবিক বাস্তবতার প্রশ্নও।ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের ক্ষেত্রে এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে সদর থেকে নান্দাইল উপজেলায় বদলি করা হয়। এর পরদিনই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে বদলি স্থগিতের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর একমাত্র মেয়ে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেয়ের পড়াশোনা ও মানসিক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সদরেই থাকার সুযোগ চেয়েছেন তিনি।
এরপর ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদও তাঁর বদলি আদেশ বাতিলের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন।
কেন এই সময়ে বদলি? মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে শাহেদের কোন অভিযোগ নেই
মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে আলোচনা অবশ্য শুধু পারিবারিক কারণে নয়।
এর আগে ‘ঘুষ.সাইট’-এ একটি অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারী শাহেদ শরীফ আহমেদের দাবি, তাঁর মৃত মায়ের সরকারি পাওনা ১০ লাখ টাকা পেতে গিয়ে তাঁদের কাছে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল।
এই অভিযোগ প্রকাশের পর ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ ও মুহাম্মদ মজিবুর রহমানকে ৩১ আগস্ট শোকজ করা হয়।তদন্ত কমিটি ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। ৯ সেপ্টেম্বর বদলি করা হয় মনিকা পারভীনকে।
এই ধারাবাহিকতার কারণে বদলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঘুষ দাবির অভিযোগটি মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে নয়। বরং অভিযোগ সামনে আসার পর তাঁর কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার তথ্য রয়েছে।
‘জনস্বার্থে’ বদলি–প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশে মনিকা পারভীনের বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু জনস্বার্থের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আদেশে নেই।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা যেকোনো সময় বদলি হতে পারেন। মনিকা পারভীনের বদলির পেছনে আলাদা কোনো কারণ আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
মনিকা পারভীন বলেছেন, তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করেছেন এবং বদলির নির্দিষ্ট কারণ তাঁর জানা নেই।
পরিবারের বাস্তবতা–মনিকা পারভীনের আবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর স্বামী ময়মনসিংহ বিভাগীয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের পরিচালক হিসেবে কর্মরত।তাঁদের একমাত্র মেয়ে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২০২৭ সালে তার এসএসসি পরীক্ষা।
একজন অভিভাবকের কাছে এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মানসিক স্থিরতার কথা বিবেচনা করে কর্মস্থল পরিবর্তন স্থগিতের অনুরোধ করেছেন তিনি।আবেদনের সঙ্গে বদলি আদেশের কপি ও মেয়ের বিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রও সংযুক্ত করেছেন।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য–সংসদ সদস্যের ডিও লেটারেও মূলত একই মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মনিকা পারভীনের একমাত্র মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা, তাঁর স্বামীর ময়মনসিংহে কর্মরত থাকা এবং পারিবারিক অবস্থানের বিষয় বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছে।
সদর উপজেলার শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা
মনিকা পারভীন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তাঁর পক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে বিদ্যালয় পরিদর্শন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফেরানো, শিক্ষকদের সমস্যা শোনা, অবকাঠামো ও যাতায়াতের বিষয় দেখভালসহ নানা কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক ও অনেক অভিভাবকদের মধ্যে তাঁর বদলিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তবে কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা নিয়ে ওঠা এসব দাবির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত সরকারি নথি, পুরস্কার ও কর্মসম্পাদনের তথ্যের ভিত্তিতে। অন্যদিকে একজন কর্মকর্তার একমাত্র সন্তান গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তাঁর স্বামীও একই শহরে কর্মরত।








