ঢাকা | জুলাই ২৯, ২০২৬ - ২:৪৮ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

কমলগঞ্জে আলোচিত বাগান উচ্ছেদের অভিযোগ

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Tuesday, July 28, 2026 - 7:31 pm
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 4 বার
রাজন আবেদীন রাজু, স্টাফ রিপোর্টার:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের পরিচালিত আইনানুগ উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বনভূমি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম চলমান থাকলেও, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত তথ্য আড়াল করে বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি এবং চলমান বনভূমি উদ্ধার অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চলছে।
উচ্ছেদ অভিযানের পর বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হয়, প্রায় ১,২০০টি ফলন্ত কমলা (মাল্টা) গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে তদন্তকারী দল ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে গাছের গুঁড়ি গণনা করে মোট ৬২৫টি মাল্টা ও কমলা গাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে প্রচারিত সংখ্যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় গত ২২ জুলাই অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান (যুগ্মসচিব)-কে প্রধান করে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) আব্দুর রহমান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শাহিনা আক্তার। তদন্ত কমিটি ২৩ জুলাই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে।
 
সংরক্ষিত বনভূমিতে দীর্ঘদিনের দখল ও চাষাবাদ
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আদমপুর বন বিটের আওতায় প্রায় ১৩ হাজার ৮০ হেক্টর বনভূমি রয়েছে। এই বিশাল বনাঞ্চল রক্ষায় রয়েছেন মাত্র একজন বিট কর্মকর্তা, চারজন বনপ্রহরী এবং ৮৬টি বন ভিলেজার পরিবার।
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর, কামারছড়া ও কুরমা বিটের প্রায় ৬ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রভাবশালী দখলকারীরা পান চাষ, বাণিজ্যিক কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে আদমপুর বিটে প্রায় ৪ হাজার একর, কামারছড়া বিটে ১ হাজার একরের বেশি এবং কুরমা বিটে প্রায় ১ হাজার একর বনভূমিতে পানের জুম গড়ে তোলা হয়েছে।
 
ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানে বনভূমি উদ্ধার
 
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া যোগদানের পর থেকে সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে পানের বরজ, অবৈধ টিনের ঘর, মাল্টা-কমলার বাগান, আনারসের ক্ষেত ও অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিপুল পরিমাণ বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে।
সবশেষে ১৬ জুলাই উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে আদমপুর বিটের ৫ একর সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার করা হয়। এ সময় অবৈধভাবে গড়ে তোলা মাল্টা, কমলা ও আনারসের বাগান, মাছের ঘের এবং অন্যান্য স্থাপনা অপসারণ করা হয়।
 
আরও বনভূমি উদ্ধারে বাধার অভিযোগ
 
বন বিভাগের দাবি, ঠিলাগাঁও এলাকায় ইকো রিসোর্টের দখলে থাকা ৬৬.৬০ একর এবং কালিছালি এলাকায় ২৩.৪৭ একর বনভূমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রভাবশালী দখলদার চক্রের বাধার মুখে পড়তে হয়।
এছাড়া গত ২৪ জুন দলই চা-বাগান এলাকায় গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের ঘটনায় তদন্ত শেষে প্রায় ৯ লাখ ৪ হাজার ৩৭৬ টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।
 
মাল্টা বাগান নিয়ে যা জানা গেল
 
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বন ভিলেজার পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে মহেব উল্ল্যা সংরক্ষিত বনভূমির প্রায় আড়াই একর জমি চাষাবাদের জন্য অলিখিতভাবে ব্যবহার করতেন। তবে তার ছেলে আলীম উল্ল্যা প্রায় আট বছর আগে কোনো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত প্রায় ৫ একর বনভূমি দখল করে মাল্টা, কমলা, নাগা মরিচ, কলা চাষ এবং টিলা কেটে মাছের ঘের নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সেখানে আবারও টিলা কেটে গর্ত খননের সময় বাধা দিতে গেলে বনকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় এক বনকর্মী আহত হন এবং সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে বন বিভাগ দাবি করেছে। এ ঘটনায় বন আইনে মামলা দায়েরের পরই যৌথ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়।
 
চাঁদা দাবির অভিযোগে অসঙ্গতির প্রশ্ন
 
উচ্ছেদ অভিযানের পর আলীম উল্ল্যা ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলা হয়। তবে অভিযোগের বিভিন্ন অংশে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
আলীম উল্ল্যার স্ত্রী সালমা বেগম দাবি করেন, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। অন্যদিকে আলীম উল্ল্যা দাবি করেন, ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। আবার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে ৮৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া মাত্র ৭ মাস এবং বিট কর্মকর্তা অর্জুন দস্তগীর প্রায় ১৭ মাস আগে ওই কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। ফলে অভিযোগে উল্লেখিত সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
 
তদন্ত চলছে
 
তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গ্রহণ করেছে।
পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন,
“ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে শিগগিরই সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) আব্দুর রহমান বলেন,
“আমি তদন্ত কাজে সহযোগিতার জন্য এসেছি। তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।”
 
বন বিভাগের অবস্থান
 
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক চাষাবাদ অপসারণ এবং বনজ সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও বনজ সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে সচেতন মহলের অভিমত, সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা কেবল বন বিভাগের নয়, এটি জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্ব। তবে আইনানুগ অভিযানকে ঘিরে অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার, বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ব্যক্তিগতভাবে কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সব পক্ষের সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।