ঢাকা : মেট্রোপলিটন থেকে র্যাট্রোপলিটন –অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-
[ ” শহরের তামাম ইদুরেরা যে যার অন্ধকার গর্ত, কুঠুরি, সেলার কিম্বা সুড়ঙ্গ ছেড়ে দলে দলে আলোতে বেরিয়ে আসতে শুরু করল । তারা যেন এক অদৃশ্য ইশারায় রাজপথে এসে আছড়ে পড়ছে, কাঁপছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে … ” ]
ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “দ্যা প্লেগ” (The Plaque) -এ একটি শহরের পতনের সূচনা এভাবেই চিত্রায়িত করেছিলেন । বিশ্ব সাহিত্যের সেরা উপন্যাসগুলোর একটি হচ্ছে কামুর “The Plague ” । উপন্যাসের ওলান শহরটি যেভাবে আচমকা ইঁদুরের উপদ্রব ও মহামারীর কবলে পড়েছিল । একবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান মেগাসিটি ঢাকা আজকে যেন এক অলিখিত নাটকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । তবে ঢাকার গল্পটা কোনভাবেই ফরাসি শহরের কাল্পনিক আখ্যান নয় বরং এক নির্মম বাস্তবতা । জর্জ অরওয়েল তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাস “1984” – এ ইঁদুরকে ব্যবহার করেছেন মানুষের বড় মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের রূপক হিসেবে । উপন্যাসের বিখ্যাত “রুম-১০১” -এ বন্দীদের মুখ ইঁদুরের খাঁচায় ঢুকিয়ে টর্চার করা হতো । “দ্যা পাইড পাইপার অফ হ্যামিলন” জার্মান ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা ; ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্প । পুরো হ্যামিলন শহর যখন ইঁদুরের যন্ত্রণায় অতিষ্ট তখন এক রহস্যময় বাঁশিওয়ালা তার বাশির সুরে সব ইঁদুরকে নদীতে ডুবিয়ে মারে । “Ratman’s Notebooks” স্টিফেন গিলবার্ট এর একটি মনস্তাত্ত্বিক হরর উপন্যাস । যেখানে এক নিঃসঙ্গ যুবক ইঁদুরের এক বিশাল বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং নিজের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ নিতে তাদের লেলিয়ে দেয় । পিকচার এমমিনেশন স্টুডিও’র Ratatouille সিনেমাটি অস্কার বিজয়ী (২০০৭) এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছবি । প্যারিসের শহরের ড্রেনের এক ইঁদুর (রোমিও ) কিভাবে তার প্রখর ঘ্রাণশক্তি ও রান্নার প্রতিভা দিয়ে শহরের এক নামি রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ হয়ে ওঠে তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছে । “The Rat Catcher ” বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক ওয়েস আন্ডারসন নির্মিত এবং রোয়াল্ড ডাল এর গল্প অবলম্বনে তৈরি একটি অসাধারণ শর্ট ফিল্ম । এতে দেখানো হয়েছে একজন অদ্ভুত ইঁদুর শিকারি ইঁদুর মারার জন্য নিজেই ইঁদুরের মত আচরণ শুরু করেছে ।
আমাদের আজকের ঢাকার ইঁদুর কাহিনীটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ।
ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে আজকের প্রধান শিরোনাম ছিল :
” ঢাকায় ইঁদুরের বংশবিস্তার : বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি” । “ঢাকার অলিগলি,কাঁচাবাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ড্রেন ও আবাসনের আশেপাশে বেড়েছে ইঁদুরের উপদ্রব । দিনের বেলায়ও খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া এসব প্রাণী নগরবাসীর জন্য শুধু বিরক্তির কারণেই নয়, বরং একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য ঝুঁকির ইঙ্গিত । …হান্টা ভাইরাস ছাড়াও ইঁদুর থেকে অন্তত ৬০ ধরনের রোগ বিভিন্ন ভাবে মানুষের দেহে ছড়াতে পারে, যার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে নগর এলাকায় বসবাসরতদের ক্ষেত্রে” ( দৈনিক বণিক বার্তা, ৬ জুন ,২০২৬ ) ।
৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকা নগরীতে বিগত দশকে আকাশচুম্বী বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয় আর মেট্রোরেল চালুর মধ্য দিয়ে ব্যাপক অবকাঠামগত উন্নয়ন ঘটেছে । এতসব চাকচিক্যের আড়ালে এক অদৃশ্য সুরঙ্গ তৈরি হচ্ছে যা এই মেট্রোপলিটনকে রূপান্তর করছে এক ইঁদুরের উপদ্রবগ্রস্ত শহর ” র্যাট্রোপলিটন” ( Ratropolition ) – এ । বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ” ইঁদুর” ছোটগল্পে এই প্রাণীর উপদ্রবকে দেখিয়েছেন গ্রামীণ দারিদ্র, মানুষের মনের হিংসা ও ভেতরকার কুৎসিত রূপের প্রতীক হিসেবে । সোমেন চন্দের গল্পে ইঁদুর ছিল নাগরিক নিম্নবিত্তের চরম অভাব ও জরাজীর্ণ পরিবেশের এক অবদমিত রূপক। কিন্তু আজকের মেগাসিটি ঢাকায় ইঁদুরের এই জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়া কেবল কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর দারিদ্র্যের প্রতীক নয় ; এটা সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা ভেঙ্গে পড়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের অবিচারের এক জীবন্ত দলিল । প্রকৃতির বিনামূল্যের ‘ঝাড়ুদার’ কাক আজ ঢাকা থেকে নির্বাসিত । জলাশয়ের প্রাকৃতিকভাবে ইঁদুর-শিকারি গুইসাপ বা মেছো বাঘ বা বেড়ালেরা আজ মানুষের নিষ্ঠুরতায় বিলুপ্তপ্রায় । ফলস্বরূপ, মানুষের তৈরি কংক্রিটের জঙ্গল ও আবর্জনার বাগার এখন পুরোপুরি ইঁদুরের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে । কামুর উপন্যাসে ইঁদুরের দলবদ্ধ আগমন ছিল আসন্ন এক ধ্বংসের পূর্বাভাস । ঢাকার রাজপথে, ড্রেনে , কিংবা আধুনিক ভবনের সিলিংয়ে ইঁদুরের এই অবাধ বিচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিবেশের ভারসাম্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কোন শহর কখনো প্রকৃত মেট্রোপলিটন হয়ে উঠতে পারে না ।
ঢাকার মাটির ওপরে যেমন কোটি মানুষের কোলাহল আর ব্যস্ততা, মাটির নিচে ড্রেন, সুয়ারেজ লাইন এবং ইউটিলিটি ট্যানেলগুলোতে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সমান্তরাল শহর । ২০০৬ সালের বিখ্যাত অমিনেটেড চলচ্চিত্র “ফ্ল্যাশড অ্যাওয়ে” (Flushed Away ) -তে দেখানো হয়েছিল লন্ডনে মাটির নিচের এক কাল্পনিক জগতের গল্প । মানুষের অলক্ষে শুয়ারেজ লাইনের ভেতর ইঁদুরেরা গড়ে তুলেছিল ‘র্যাট্রোপলিশ’ নামের এক ব্যস্ত শহর । চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দার কল্পকাহিনী আজ ঢাকাবাসীর জন্য এক রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতা । চলচ্চিত্রের সেই ইঁদুরদের মতোই ঢাকার ভূগর্ভস্থ বাসিন্দারা আজ আর মাটির নিচে সীমাবদ্ধ নেই । পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি, কাওরান বাজারের আড়ত কিম্বা মতিঝিলের বাণিজ্যিক এলাকা পেরিয়ে এরা ঢুকে পড়েছে গুলশান-বনানীর মত এলাকার আধুনিক বহুতল ভবনের ফলস সিলিং, এসির ডাক্ট, কিংবা রান্না ঘরে । মানুষের তৈরি বর্জ্য আর অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে মাটির নিচের রেট্রোপলিটন উপরের মেট্রোপলিটনকে গিলে খেতে উদ্যত হয়েছে ।
একটি সুস্থ্য নগরীর শহুরে প্রতিবেশ (urban ecosystem) সবল থাকা জরুরী । ঢাকা থেকে কাকের বিদায় ইঁদুরের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আগে দিনের বেলায় কাক ও চিল আবর্জনার স্তুপের উপর নজরদারি করত এবং ছোট ইঁদুর বা তাদের ছানা শিকার করত । এখন উঁচু গাছের অভাব, মোবাইল টাওয়ারের ক্ষতিকর রেডিয়েশন এবং ফরমালিন যুক্ত বিষাক্ত বর্জ্য খেয়ে কাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেছে । ফলে ডাস্টবিনগুলোতে খাদ্যের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ইঁদুরেরা একচেটিয়া পুষ্টি গ্রহণ ও বংশবিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে । ( অনেকটা বড় রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে গর্তের রাজনৈতিক দলের বলিয়ান হওয়ার মতো ) । উন্নত দেশে আধুনিক মেট্রোপলিটনের পরিচ্ছন্নতার জন্য দামি ‘ভ্যাকুয়াম ক্লিনার’ ব্যবহার করে । কাক হল ঢাকা শহরের প্রতিবেশে প্রাকৃতিকভাবে নিখরচায় পাওয়া এক স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার । মানুষের ফেলা পচনশীল বর্জ্য যেখানে ব্যাকটেরিয়ার কারখানা তৈরি করে, কাকেরা তাদের ডানা আর ধারালো ঠোঁট দিয়ে সেই কারখানাকে মুহূর্তেই গুড়িয়ে দেয় । শুধু তাই নয়, এরা আমাদের শহরের এক অদৃশ্য এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম (Air Defence System) । মাটির নিচে বা ড্রেনের গর্ত থেকে ইঁদুরের দল যখনই দিনের আলোতে মাটির উপর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আকাশের অতন্দ্র প্রহরীরা উপর থেকে বাজপাখির মত ইঁদুর ধরে নিয়ে যায় । রাতের বেলায় একই কাজ করে পেঁচা । কাক, চিল ও পেঁচার সংখ্যা বাড়ানো মানে হল ইদুরের বিরুদ্ধে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সচল করা ।
কামুর উপন্যাসে ইঁদুর যেভাবে মহামারী প্লেগ এনেছিল, ঢাকাতেও ইদুর নীরব ঘাতক হিসেবে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে । গ্রীক পুরাণের সেই বিখ্যাত ট্রোজেন হর্সের কথা আমাদের সবার জানা আছে । টয় নগরীর মানুষ যাকে কাঠের তৈরি এক নিরীহ উপহার হিসেবে মনে করে ভেতরে এনেছিল, রাতের অন্ধকারে তার পেট থেকেই বেরিয়ে এসেছিল একদল খুনি সৈনিক , যারা ধ্বংস করেছিল পুরো শহরকে । ঢাকার শহরের প্রতিবেশে ইঁদুর তেমনি একটি ট্রোজেন হর্স । আমরা আপাতদৃষ্টিতে এদের কেবল রান্না ঘরের উৎপাত কিংবা শস্য নষ্টকারী এক সাধারণ জীব মনে করে এড়িয়ে যাচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে আসলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি এক জীবন্ত টাইম বোম । ইঁদুরের শরীর ও মলমূত্র বহন করছে লেটেস্টোপাইরোসিস, সালমোনেলোসিস কিংবা scrab typhus এর মত মারাত্মক সব রোগের জীবাণু । বর্ষাকালে ঢাকার রাস্তায় যখন হাঁটু বা কোমর পানি জমে তখন ইদুরের মূত্র মিশ্রিত সেই পানি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অলক্ষে লিভার ও কিডনি বিকল করে দেয় । আমরা আসলে এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে আমাদের মেট্রোপলিটনের বড়াই করছি, যার মাটির নিচে বিষাক্ত লাভা হলো এই লাখ লাখ ইঁদুর । এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোন মুহূর্তে এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় পুরো শহরকে এক অবর্ণনীয় মহামারীর মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে । …(চলবে)








