ঢাকা | জুন ১৬, ২০২৬ - ৩:৫৯ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

কুৎসা : অচেনা ছায়াযুদ্ধ, অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Tuesday, June 16, 2026 - 6:47 am
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 17 বার
{ “কুৎসা হল এমন এক বিষাক্ত বাষ্প যা ক্ষণিকের জন্য হলেও সবচেয়ে উজ্জ্বল গুণটিকেও ম্লান করে দিতে চায়; কিন্তু বাতাস পরিষ্কার হলে আলো আবার ঠিকই বেরিয়ে আসে।”  –ভলতেয়ার  ]
মানুষের সামাজিক ও মানসিক অস্তিত্বের একটা অদ্ভুত পরিধি থাকে । এই পরিধির ভেতরে থাকে চেনা মানুষের আনাগোনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ,স্বার্থের সংঘাত এবং ভালোবাসার আদান-প্রদান । কিন্তু এই চেনা জগতের বাইরেও রয়ে যায় এক সুবিশাল ধূসর এলাকা-  যেখানে সম্পর্কের কোন দৃশ্যমানতা নেই, চেনা-জানার কোন যৌথ অতীত নেই । অথচ বিস্ময়কর ভাবে সেই অচেনা সীমান্ত থেকেও কখনো কখনো উড়ে আসে তীব্র বিষাক্ত বাণ ।  এই বিষয়টি কোন শারীরিক আঘাত নয়, এর নাম-  কুৎসা ।
যার সাথে কোনদিন মুখোমুখি আলাপ হয়নি, যার সাথে কোন পেশাদার বা ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ নেই, এমনকি যার অস্তিত্বের সাথে নিজের প্রাত্যহিক জীবনের কোন সুদূর যোগসূত্র নেই-  এমন একজন মানুষ যখন অন্য  কারো নামে মিথ্যা অপবাদ, চরিত্র হনন বা কুৎসা রটান, তখন মানব সভ্যতা এক গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন হয় । এই অনাকাঙ্ক্ষিত বৈরিতা, এই বেনামী বিদ্বেষ আসলে কিসের ইঙ্গিত দেয়?  সাহিত্য, দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা স্পষ্ট যে এই কুৎসা রটনা আসলে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ । যিনি কুৎসা রটাচ্ছেন তিনি আসলে সামনের মানুষটার সাথে লড়ছেন না; তিনি লড়ছেন নিজের ভেতরে এক চরম অতৃপ্তি, হীনমন্যতা  এবং আত্মিক একাকিত্বের সাথে ‌।  এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের সেই অমোঘ  উক্তি,  “নিন্দুকেরা আসলে এক ধরনের পরজীবী; নিজেরা কোন সৃষ্টি  করতে পারেনা বলে অন্যের সৃষ্টির রক্ত চুষে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।”
* কুৎসা: মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ
মনস্তত্ত্বের দুই মহান মনিষী সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং জাক লাকার তত্ত্বের আলোয় ফেললে এই সম্পর্কহীন কুৎসাকারীদের মানসিক কঙ্কালটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয় ।  সিগমুন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) অকারনে কুৎসা রটনা কোন বাহ্যিক ঘটনা নয়, এটি মানুষের ভেতরের এক অবদমিত ও বিকৃত আত্মরক্ষামূলক কৌশল (defence mechanism) । একে ফ্রয়েডীয় ভাষায় প্রোজেকশন (projection) বা নিজের দোষ অন্যের উপর চাপানো বলা হয় । মানুষের মনের গভীর অন্ধকারে এমন কিছু কুৎসিত ইচ্ছা, ব্যর্থতা বা হীনমন্যতা লুকিয়ে থাকে যা সে নিজের সচেতন মনের কাছেও স্বীকার করতে পারে না । তখন তার মন এই ‘ইগো'(Ego)-কে এক আলিক পবিত্রতা দিতে অদ্ভুত কৌশল নেয় । ব্যক্তি নিজের ভেতরের সেই গোপন খামতি বা অনৈতিক বসনাগুলোকে অন্যের চরিত্রের উপর আরোপ করে । অর্থাৎ কুৎসাকারী আসলে যার কুৎসা রটাচ্ছেন, তার মধ্যে নিজেরই অবদমিত অন্ধকার রূপটি দেখতে পান । এটি মানুষের আদিম অবদমিত ইচ্ছা (Id)  এবং সামাজিক নৈতিকতার(Superego) দ্বন্দ্বের বিকৃত বহিঃপ্রকাশ,  যাকে এক ধরনের ‘sadism’ বা অন্যকে মানসিক কষ্ট দিয়ে সস্তা আনন্দ বলা যেতে পারে ।
অন্যদিকে ফরাসি মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক জাক লাকা (১৯০১-১৯৮১) এই মনস্তত্ত্বকে আরো গাঠনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন । লাকার বিখ্যাত ‘দর্পণ পর্যায়’ (The Mirror  Stage) তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ শৈশবে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে প্রথম  নিজের অবয়ব সম্পর্কে এক অখণ্ড ধারণা পায়,  যা আসলে এক ধরনের বিভ্রম (illusion) । কুৎসাকারীদের ক্ষেত্রে এই দর্পণ পর্যায়টি আজীবন এক মানসিক বিকার তৈরি করে । দূর থেকে সে যখন অন্য কোন মানুষকে সম্পূর্ণ, সফল,  সুন্দর বা সুখী দেখে, তখন তার নিজের ভেতরের অসম্পূর্ণ সত্তা বা ভাঙ্গা প্রতিচ্ছবিটি তার সামনে আয়নার মতো ভেসে ওঠে । এই হীনমন্যতার দাহ সহ্য করতে না পেরে সে তখন ভাষার হিংস্র ব্যবহার শুরু করে । মানুষ যা চায় তা আসলে তার নিজের চাওয়া নয়, তা হলো ‘অন্যের আকাঙ্ক্ষা’ (the desire of the others) । কুৎসাকারী যখন দেখে অন্য একজন মানুষ এমন কিছু জীবনের স্বাদ বা আনন্দ উদযাপন করছে যা সে নিজে কখনো পায়নি, তখন তার মনে তীব্র ঈর্ষা জন্ম নেয় । লাকা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কুৎসাকারী কিন্তু সামনের মানুষটার ধন-সম্পদ কেড়ে নিতে চায় না, ‘সে চায় সামনের মানুষটার সুখ ও আনন্দকে ধুলিস্যাৎ করতে’ । কুৎসা রটানো হল সেই আনন্দ কেড়ে নেয়ার একটি হিংস্র মনতাত্ত্বিক প্রচেষ্টা ।
* কুৎসা : দার্শনিক দৃষ্টিকোণ
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অকারণে কুৎসা রটনা হল আত্মার চরম দেউলিয়াত্বের বিজ্ঞাপন । কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত(১৮১২-১৮৫৯) যেমন লিখেছিলেন-
         “আপনার ভালো সবে ভালো বলে মানে ‌।
          পরের ভালোতে মন্দ পরনিন্দা জানে ।”
জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে (১৮৪৪-১৯০০) তাঁর দর্শনে ‘রিসেনটিমেন্ট’ (Ressentiment) এর ধারণার বর্ণনা দিয়েছেন । এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে দুর্বল। বা ব্যর্থ মানুষ নিজের অক্ষমতার জন্য তীব্র ক্ষোভ ও পুঞ্জিভূত বিদ্বেষ হৃদয়ে পুষে রাখে । যেহেতু সে নিজের উপরে  ওঠার ক্ষমতা দেখতে পায়না, তাই সে এক ধরনের দাস-মানসিকতা (Slave Morality) থেকে অন্যের শ্রেষ্ঠত্বকে পাপ বা  অন্যায় বলে প্রচার করতে শুরু করে  ‌। কুৎসা রটনাকারীরা হল এই ‘রিসেনটিমেন্ট’-এর  জীবন্ত প্রতীক । আলো দেখলে অন্ধকারের যেমন দাহ উপস্থিত হয়, অকারণে কুৎসা  রটনাকারী মানুষের মনস্তত্ত্ব ঠিক তেমন-  সামনের মানুষটির কোন অপরাধ নেই, তার অপরাধ কেবল সে আলো ছড়াচ্ছে । দার্শনিকরা মনে করেন মানুষ যখন নিজের জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পায় না, তখন তার অস্তিত্ব চরম  শূন্যতায় (Nihilism ) পর্যবসিত হয়, তখন সে অন্যের জীবনকে কলঙ্কিত করার মধ্যে এক অলীক সার্থকতা খুঁজে ।
* কুৎসা : বিশ্ব সাহিত্যের দর্পণে
বিশ্ব সাহিত্যের পাতা উল্টালে মানুষের এই অকারণ পরশ্রীকাতরতা এবং কুৎসা রটনার বহু ধ্রুপদী ও কালজয়ী উদাহরণ মেলে । উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের (১৫৬৪-১৬১৬) বিখ্যাত নাটক ওথেলো-র খলনায়ক ইয়াগো-র কথা এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক । ওথেলো বা ডেসডিমোনা ইয়াগোর কোন ক্ষতি করেনি, তবুও কেবল অকারণ ঈর্ষা আর অন্যের পতন দেখার কুৎসিত আনন্দ পাওয়ার জন্য সে একের পর এক মিথ্যার জাল বুনে একটি নিটোল সুখী জীবন ধ্বংস করেছিল ‌।  শেক্সপিয়র তাই হিংসা ও কুৎসাকে তাঁর নাটকে চমৎকারভাবে বিবৃত করেছেন:
“ওহে আমার প্রভু, হিংসা থেকে সাবধান !
এটি হলো সেই সবুজ চোখা দানব,
 যা যাকে গ্রাস করে তাকে নিয়েই উপহাস করে।”
 ফরাসি উপন্যাসিক ও নাট্যকার আনোরে দ্য বালজাক (১৭৯৯-১৮৫০) তাঁর ‘Le Pere Goriot’ উপন্যাসে লিখেছেন কুৎসা হলো সমাজের সেই পিগমি বা বামুনদের মত যারা নিজেরা উচ্চতায় বড় হতে পারে না বলে তলোয়ার দিয়ে অপরের পা কেটে নিজের সমান করতে চায় । রুশ সাহিত্যিক ফিওদোর দসতয়েভসকি ( Fyodor Dostoevsky , ১৮২২-১৮৮১)তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘Notes from  Underground’ -এ দেখিয়েছেন মানুষ যখন নিজের ভেতরের সত্তাকে ভালবাসতে পারে না, তখন সে অন্যের অস্তিত্বকে ঘৃণা করতে শুরু করে । এই সম্পর্কহীন কুৎসা আসলে সেই গভীর আত্মবিদ্বেষেরই এক নিষ্ঠুর সামাজিক বহিঃপ্রকাশ । ‘Notes from Underground’-কে পৃথিবীর প্রথম ‘অস্তিত্ববাদী’ উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয় । উপন্যাসের মূল চরিত্র ও কথক একজন নামহীন ব্যক্তি, যাকে সাহিত্যে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’ বলা হয়  । সে সমাজের কোনো মূল ধরার সাথে যুক্ত নয় (সম্পর্কহীন) । এই আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান চরিত্রটি নিজের ব্যর্থতা ,একাকীত্ব ও হীনমন্যতা থেকে পুরো সমাজ ও মানুষের উপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেয় । সে সমাজের তথাকথিত প্রগতি, সুখ ও মানুষের ভালো থাকাকে মন থেকে ঘৃণা করে ।
বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে এই ব্যাধির  উপস্থিতি লক্ষ্য করে আমাদের কথা সাহিত্যিকরা তাদের অমর সৃষ্টিতে কুৎসাকারীদের চরিত্র নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছে  । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কণিকা’ কাব্যে এই স্বভাবকে এক লাইনে বেঁধেছিলেন-
      “খল বলে, ‘ধন্য তুমি ওগো মহাশয়,
      মোর পিঠে যত পারো করো পদাঘাত ।’
      ভালোমানুষের পিঠে বোঝা নাহি রয়,
        পদাঘাত সহিবারে খল সদা পাত ।”
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের ‘বেণী ঘোষাল’ ও ‘গোবিন্দ গাঙ্গুলী’ যেন আমাদের চারপাশের সেই চেনা কুৎসাকারীর আদি রূপ । রমেশ বা রমা তাদের কোনো ক্ষতি করেনি, বরং গ্রামের ভালো করতে চেয়েছিল ‌ কিন্তু নিজেদের সংকীর্ণতা ও অন্যের ভালো সহ্য করতে না  পারার ব্যাধি থেকে তারা সমাজকে ব্যবহার করে রমা ও রমেশের পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্কিত করতে কুৎসার এক জটিল জাল বুনেছিল ।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ বা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসেও চন্ডীমন্ডপের আড্ডায় বসা কিছু পরচর্চাকারি চরিত্রের দেখা মেলে যাদের নিজের জীবনের কোন লক্ষ্য নেই, কিন্তু অন্যের হাড়ির খবর নেওয়া এবং তিলকে তাল করে কুৎসা রটনাই ছিল প্রধান কাজ।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প ‘ল্যাবরেটরি’-তেও দেখা যায় সমাজের তথাকথিত হিতৈষী ও সম্পর্কহীন মানুষজন অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসার রটাতে কতটা উন্মুখ হয়ে থাকে । কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় যেন এই সমাজচিত্রেরই হাহাকার ফুটে ওঠে:
“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান !
…অথচ মানুষই মানুষের নামে রটায় কলঙ্ক গান ।”
* কুৎসা: ভার্চুয়াল ট্রোলিং
অতীতে যে কুৎসা রটনা সীমাবদ্ধ ছিল পাড়ার চায়ের দোকানে, চন্ডীমন্ডপে কিংবা অন্দরমহলের ফিসফিসানিতে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা এক ভয়াবহ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে । সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া এখন এই অকারণে কুৎসা রটনার সবচেয়ে বড় প্রজনন ক্ষেত্র । ফেসবুক,ইউটিউব বা এক্স (টুইটার) এর মত প্লাটফর্মগুলো আজ কুৎসা রটনাকারীদের হাতে তুলে দিয়েছে এক অদৃশ্য ঢাল-  ‘ফেক আইডি’ বা ছদ্মনাম ।
পর্দার ওপারে বসে, নিজের পরিচয় লুকিয়ে, সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একজন মানুষের চরিত্র হনন করা এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার । একেই আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘কিবোর্ড ওয়ারিয়রদের ট্রোলিং ব্যাধি’ । লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আর সস্তা ভাইরাল হওয়ার লোভে মানুষ আজ অন্যের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসম্মুখে ব্যবচ্ছেদ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। অনেকে এটাকে মনিটাইজেশন এর মাধ্যমে অর্থ (ডলার) উপার্জনের একটা উপায় হিসেবেই গ্রহণ করেছে । অর্থলোভী টিকটকার ও ইউটিউবাররা  আমাদের সামাজিক ফেব্রিক্স এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ইতিমধ্যেই অনেকটা ধসিয়ে দিয়েছে । সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগারিদমও অদ্ভুতভাবে নেতিবাচকতাকে এবং মানুষের আদিম কুৎসা শোনার  প্রবৃত্তিকে বেশি ছড়িয়ে দেয় । বিদেশে পলাতক কয়েকজন তথাকথিত সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সাররা কিভাবে সারাক্ষণ ঘৃণা, কুৎসা, অশ্লীল গালিগালাজ এবং উস্কানি ছড়িয়ে আমাদের সমাজকে দূষিত করেছে তা আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখেছি । এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় মানুষ আজ একে অপরকে চেনে না, কিন্তু একে অপরের দিকে বিষাক্ত কাদা ছুঁড়তে বিন্দুমাত্র ভাবছে না । এটি কেবল কোন ব্যক্তির ক্ষতি করছে না, বরং পুরো মানব সমাজকে এক চরম সহানুভূতিহীন নিষ্ঠুর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ।
* কুৎসা : ধর্মীয় বিধান ও আইনী প্রতিকার
কুৎসা রটনার বিষয়ে প্রচলিত প্রায় সব ধর্মেই সতর্কতা ও সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে । পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মই কুৎসা রটনা ও পরনিন্দাকে অনৈতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে ক্ষতিকর পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে । ইসলাম ধর্মে কুৎসা রটনাকে (গীবত) নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মত জঘন্য কাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে(সূরা:হুজুরাত, আয়াত ১২) । বিনা প্রমাণে সতী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদের শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে । ইসলামে কুৎসা রটনা যেমন অপরাধ, তা চুপচাপ শোনাও সমান অপরাধের শামিল । হিন্দু ধর্মে একে একটি মহাপাপ ও তামসিক গুণ বলা হয়েছে । কুৎসা রটালে মানুষের নিজের পুণ্য ক্ষয় হয় এবং কার্যফল এর নিয়ম অনুযায়ী রটনাকারীকে পরবর্তীতে দুঃখ ও দূর্গতি পোহাতে হয়। খ্রিষ্ট ধর্মে দশ আজ্ঞার(ten commandments) অন্যতম একটি হলো “মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া” । ‘নিউ টেস্টামেন্টে’  জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, কুৎসা রটনা পুরো জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে । বুদ্ধের ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের’ অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘সম্যক বাক্য’ (Right Speech), যা পরনিন্দা, মিথ্যা ও কঠোর শব্দ বর্জন করে কেবল সত্য ও কল্যাণকর কথা বলতে শেখায় । বুদ্ধের উপদেশ হলো, অন্যের মিথ্যা নিন্দা বা কুৎসায় উথাল-পাতাল না হয়ে চিত্তকে শান্ত ও অপ্রমত্ত রাখা উচিত ।
প্রাচীন রোমান আইন, মধ্যযুগীয় ইংরেজি সাধারণ আইন এবং প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে (যেমন: কৈটেল্যের অর্থশাস্ত্র ) সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে কুৎসা করটনাকারীদের কঠোর শারীরিক ও আর্থিক শাস্তির বিধান ছিল । বাংলাদেশে কার্যকর দন্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা রটনা দণ্ডনীয় অপরাধ । দন্ডবিধির ৫০১ ও ৫০২ ধারাতে মানহানিকর কুৎসা রটনাকারীদের সহযোগীদেরও শাস্তির বিধান আছে । ইদানিং কালের সাইবার আইনেও কুৎসা রটনাকে মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে ।
ধর্মীয় বিধি নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় বক্তা ও গুরুদেরকেও অন্য ধর্মের ব্যাপারে বা তাঁর নিজস্ব মতামতের বাইরের লোকদের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা এবং কুৎসা রটনা করতে দেখা যায় । একই অবস্থা রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । যাদের আইন মান্য করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করার কথা ছিল, তারা প্রতিনিয়ত বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে যাচ্ছে ।
* উপসংহার :
পরিশেষে বলা যায় অকারনে কুৎসা রটনা যিনি করেন ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত তারই বেশি হয় ।  প্রবাদে যেমন বলা হয়, ‘অন্যের দিকে কাদা ছুঁড়লে নিজের হাতটাই আগে নোংরা হয়’ । যে মানুষটি কুৎসা রটাচ্ছে সে আসলে নিজের মনের নোংরা আয়নাটিকেই পৃথিবীর সামনে মেলে ধরছে, এটি একটি মারাত্মক আত্মঘাতী  প্রবৃত্তি । সম্পর্কহীন মানুষের এই  বিষোদগার আসলে তাদের নিজেদের আত্মার আর্তনাদ, যা শুদ্ধতার আলো ও সৌন্দর্যের উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না । আলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস যাদের নেই, তারাই অন্ধকারের আড়ালে বসে কুৎসার জাল বোনে ।
বিজ্ঞান আর দর্শনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এ পি জে আব্দুল কালাম কুৎসাকারীদের মুখোমুখি হওয়ার এক দারুন পথ দেখিয়েছেন-  “যদি কেউ তোমার সমালোচনা বা কুৎসা রটায়,  তবে মন খারাপ করো না । মনে রাখবে, যেকোন খেলায় দর্শকরাই কেবল চিৎকার করে, খেলোয়াড়রা নয় । তুমি তোমার খেলা খেলে যাও ।”
কুৎসা সাময়িকভাবে কোন মানুষের চলার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করতে পারে, কিন্তু চিরকালের জন্য আলোর গতিকে রোধ করতে পারে না । এই মানসিক ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে কেবল কুৎসাকারীকে প্রতিহত করাই যথেষ্ট নয়, বরং কুৎসার ভেতরে সেই মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারকে চেনা এবং সামাজিকভাবে তা বর্জন করা জরুরী । মানুষের মন যখন নিজের সৃজনশীলতায় মগ্ন হবে, তখনই কেবল অন্যের আলোর প্রতি এই অন্ধ আক্রোশের অবসান ঘটবে ।