জামাই-শ্বশুর মিলে, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বেনাপোল বন্দরে পণ্য চুরি ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা:
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে বিএনপির নাম অপব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সরকারি ও আমদানিকৃত পণ্য চুরির অভিযোগ উঠেছে। শুধু চুরিই নয়, এই অপরাধ ধামাচাপা দিতে ও ভিন্ন খাতে মোড় নিতে চক্রটি ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে ‘জামাই-শ্বশুর’ সিন্ডিকেট, কুখ্যাত চোরাকারবারি ‘গোল্ড শহিদ’ এবং বন্দর অভ্যন্তরের বিতর্কিত ব্যক্তি শহিদ আলী ওরফে ‘শহিদ মামুর’ নাম জোরালোভাবে সামনে এসেছে। সম্প্রতি এক গোয়েন্দা সূত্র মতে, এরাই মূলত এই অপকর্মে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণ করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে তদন্তকারী এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গোল্ড শহীদ ও তার আপন চাচাতো শশুর শহিদ আলী ওরফে শহীদ মামু বেনাপোলে এই চুরির সঙ্গে জড়িত তাদের নামে গোয়েন্দা প্রতিবেদন খুব দ্রুত সময়ে প্রদান করা হবে। তিনি বলেন, শুধু একটি গোয়েন্দা সংস্থা নয় বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব তদন্ত এখনও চলমান রেখেছে।
তিনি বলেন, এর সঙ্গে তবিবুর রহমান তবি (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বেনাপোল পোর্ট ৯২৫), মোঃ শহিদ আলী সাধারণ (সম্পাদক বেনাপোল পোর্ট ৯২৫
২ নম্বর গেট ২৬ নম্বর সেট থেকে মালামাল চুরি মুল হোতা), সদার জিয়া পিতা মোঃ হোসেন, মোঃ রফিকুল, মোঃ শাজাহান পিতা মোঃ কামালসহ বেশ কয়েকজন এসব অপরাধের যুক্ত।
ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন দেশজুড়ে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ চলছে, তখন বেনাপোল বন্দরে এই চক্রের এমন বেপরোয়া কাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও সচেতন মহল। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার দায়ে এই চক্রের সদস্যদের দ্রুত দল থেকে আজীবন বহিষ্কার এবং আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
যেভাবে চলতো বেনাপোলের ‘নিরাপদ’ চুরি ও ধামাচাপার খেলা:
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী শাসনামলের মতোই স্টাইল বদলে বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন শেড ও গোডাউন থেকে ভারতীয় কসমেটিকস, উন্নতমানের কাপড়, সুতা, কেমিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পার্টস গায়েব করে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চক্রটি রাতারাতি খোলস বদলে নিজেদের ‘বিএনপির কট্টর সমর্থক’ ও ‘নেতা’ দাবি করে বন্দরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো শেড থেকে আমদানিকৃত পণ্য সম্পূর্ণ গায়েব করে দিয়ে সেখানে ইট-বালু বা সস্তা জিনিস দিয়ে ওজন মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছে জামাই-শ্বশুর সিন্ডিকেট, গোল্ড শহিদ এবং শহিদ মামু। চুরির ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কথিত কিছু মধ্যস্বত্বভোগীকে বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায় তারা।
কারা এই অপরাধ চক্রের মূল হোতা?
অনুসন্ধানে ও সচেতন মহলের দেওয়া তথ্যে এই চক্রের চারজন মূল হোতার নাম বারবার উঠে আসছে:
জামাই-শ্বশুর সিন্ডিকেট: বন্দরে পণ্য খালাস এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও পণ্য চুরির নেপথ্য কারিগর এই জামাই-শ্বশুর জুটি। এদের খুঁটির জোর কোথায়, তা নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
গোল্ড শহিদ: পূর্বে সোনা চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসার সাথে জড়িত থাকা এই ব্যক্তি এখন নিজেকে বিএনপির বড় নেতা পরিচয় দিয়ে বেনাপোল বন্দর চত্বর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বন্দরের শেড থেকে পণ্য সরানো ও তা নিরাপদে পাচার করার মূল লজিস্টিক সাপোর্ট আসে তার মাধ্যমেই।
শহিদ আলী (শহিদ মামু):
বন্দরের ভেতরের ‘ইনসাইডার’ হিসেবে পরিচিত এই শহিদ মামু। কোন গোডাউনে কী দামী মাল আছে, কখন নিরাপত্তা শিথিল থাকে—সব তথ্য পাচার ও চুরির মালামাল সরাতে ইনিই প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন।
যুবদলের কেন্দ্রীয় দুই নেতার কড়া হুঁশিয়ারি:
বেনাপোল বন্দরে বিএনপির নাম ব্যবহার করে এই ধরণের জঘন্য অপকর্মের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই শীর্ষ নেতা। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধীর কোনো দল নেই এবং বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কাউকে পকেট ভারী করতে দেওয়া হবে না।
নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সহ-সভাপতি বলেন: “আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমাদের নেতাকর্মীরা রক্ত দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের জন্য; কোনো চোর-বাটপার বা চোরাকারবারির পকেট ভারী করার জন্য নয়। বেনাপোল বন্দরে যারা বিএনপির নাম ব্যবহার করে পণ্য চুরি করছে, তারা দলের বন্ধু নয়, শত্রু। এই জামাই-শ্বশুর সিন্ডিকেট, গোল্ড শহিদ বা শহিদ মামু—এরা যেই হোক না কেন, এদের সাথে যুবদল বা বিএনপির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ করব, এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিন। দলগতভাবেও এদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা হাইকমান্ডকে সুপারিশ করছি।”
যুবদলের কেন্দ্রীয় আরেক সহ সাধারণ সম্পাদক বলেন,”বেনাপোল বন্দর দেশের অর্থনীতির ফুসফুস। এখানে কোনো চোরের সিন্ডিকেটকে রাজত্ব করতে দেওয়া হবে না। যারা বিএনপির নাম ভাঙিয়ে পূর্বের ফ্যাসিবাদের স্টাইলে গোডাউনের মালামাল চুরি করছে এবং তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তারা মূলত দেশনায়ক তারেক রহমানের দেওয়া সুশাসনের বার্তাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, গোল্ড শহিদ কিংবা শহিদ মামুর মতো চিহ্নিত অপরাধীদের বিএনপিতে কোনো স্থান নেই। এদের অতি দ্রুত দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।”
ফুঁসে উঠেছে সচেতন মহল ও ব্যবসায়ী সমাজ:
বেনাপোলের সাধারণ ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক সমাজ এই সিন্ডিকেটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী জানান, বন্দর থেকে পণ্য চুরি হয়ে গেলে ভারতীয় রপ্তানিকারক এবং দেশীয় আমদানিকারকদের কাছে বেনাপোলের সুনাম নষ্ট হয়। ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা লো








