ঢাকা | জুলাই ২৫, ২০২৬ - ৭:৩৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

গোদাগাড়ীর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যান মাদককারবারি সোহেল এখনো বীরদর্পে

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Saturday, July 25, 2026 - 11:58 am
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 13 বার

রাজশাহী : ১৫ বছর আগে যে যুবকের পরিচয় ছিল বাসের হেলপার, মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে তিনি এখন শতকোটি টাকার বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানার উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে মাদকের সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদ।

৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত এই শীর্ষ মাদককারবারি ও নাশকতা মামলার আসামি এখনো এলাকায় ‘বীরদর্পে’ চলাফেরা করছেন।

রাজনীতি ও টাকার জোরে অপ্রতিরোধ্য সোহেল

গোদাগাড়ীর গোয়েন্দা ও থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোহেল রানার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে নাটোর সদর থানায় হেরোইনসহ গ্রেপ্তারের মামলা, ২০১৩ সালে মারামারির মামলা এবং ২০১৭ সালে নাশকতার মামলা রয়েছে। ২০১৭ সালের মামলায় তাকে ৩৪ দিন হাজতবাসও করতে হয়।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশের বিশেষ অভিযান ও ক্রসফায়ারের আতঙ্কে আত্মগোপনে যান সোহেল। পরবর্তীতে ফিরে এসে ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় দুই কোটি টাকা দিয়ে স্থানীয় রাজনীতি প্রভাবান্বিত করে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

 

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অপসারিত মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক এমপি আসাদুজ্জামান আসাদ এবং স্থানীয় সাবেক এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সাথে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল।

স্থানীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে গেলেও বর্তমানে স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি প্রকাশ্যে কাজ করছেন এবং নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

মাদক সাম্রাজ্যের জাল ৩৪ বছর বয়সী সোহেল রানা ও তার স্বজনদের নাম বারবার উঠে এসেছে বড় বড় মাদকের চালানের সাথে।

সোহেল রানার মামা গোলাম রাব্বানী ও শ্যালক সবুজকে এক কেজি করে মোট দুই কেজি হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করেছিল বিজিবি। অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধারকৃত এসব চালানের মূল মালিক ছিলেন সোহেল নিজেই।

মাদক দিয়ে শুরু উত্থান: বাস হেলপারি ছেড়ে গত এক যুগে মূলত হেরোইন চোরাচালানকে মূল হাতিয়ার বানিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি।

 

বিপুল অবৈধ সম্পদ ও বিলাসী জীবন

মাদকের অর্থ বিনিয়োগ করে সোহেল গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়

আবাসন ও জমি নগরীর নিউমার্কেটের বিলাসবহুল প্লাজায় কিনেছেন নিজস্ব ফ্ল্যাট। গোদাগাড়ীতে রয়েছে অন্তত ২০ বিঘা জমি।

ব্যবসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর নিউমার্কেটে বিগবাজার ও শ্রাবণ ফ্যাশন নামে দুটি দোকান, প্লাজার দ্বিতীয় তলায় কসমেটিকস ও কাপড়ের দোকান এবং একটি ফুড কর্নার। এছাড়া নগরীর একটি পুকুর ভরাট করে গড়ে তুলেছেন বহুতল মার্কেট।

যানবাহন ৪টি ট্রাক ও ১টি ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারের মালিক তিনি।

 

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে রাজশাহী—দীর্ঘ এই সীমান্ত রুটজুড়ে গড়ে উঠেছে এক বিশাল মাদক সিন্ডিকেট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) শীর্ষ তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি টেকনাফের জামাল উদ্দিন এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানার যৌথ নেটওয়ার্কে বর্তমানে বিপর্যস্ত পুরো উত্তরবঙ্গ।

যেভাবে চলছে টেকনাফ-টু-গোদাগাড়ী ট্রাফ্যাকিং রুট

কক্সবাজারের টেকনাফ শীর্ষ মাদক কারবারি জামাল উদ্দিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে টেকনাফ সীমান্ত থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান পাঠানো হচ্ছে রাজশাহীতে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী মাটিকাটা ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা গোদাগাড়ীকে ট্রানজিট পয়েন্ট বানিয়ে টেকনাফ থেকে আসা এসব চালান গ্রহণ করছেন।

গোদাগাড়ী থেকে দ্রুত এসব মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরসহ পুরো উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়।

জনপ্রতিনিধির আড়ালে মাদকের সাম্রাজ্য

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা তালিকায় সোহেল রানার নাম শীর্ষে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতিনিধির পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সোহেল রানা টেকনাফের সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে উত্তরবঙ্গে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জনপ্রতিনিধি হয়েও সোহেল রানা এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় উত্তরবঙ্গের যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে। চেয়ারম্যানের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও টেকনাফের চিহ্নিত গডফাদারদের ভয়ে স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পান না।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মাটিকাটা ইউনিয়ন ও গোদাগাড়ী সীমান্তকেন্দ্রিক এই নেটওয়ার্কের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত যেকোনো মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচাতে টেকনাফের জামাল ও গোদাগাড়ীর সোহেল রানার মতো চিহ্নিত গডফাদারদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে পুরো সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।