ঢাকা | জুন ১০, ২০২৬ - ৫:৫৫ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

বারবার অনিয়ম, বারবার সংশোধন: কমলগঞ্জ হাসপাতাল প্রকল্পে প্রশ্নের মুখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

  • দৈনিক নবোদয় ডট কম
  • আপডেট: Wednesday, June 10, 2026 - 10:28 am
  • News Editor
  • পঠিত হয়েছে: 32 বার
রাজন আবেদীন রাজু, স্টাফ রিপোর্টার: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়নকাজ যেন অনিয়মের এক অন্তহীন চক্রে পরিণত হয়েছে। একের পর এক অভিযোগ, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন, অভিযোগের সত্যতা মিললে তড়িঘড়ি করে ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা কিন্তু প্রশ্ন একটাই, বারবার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
 
সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালের কিচেন রুমে টাইলস বসানোর কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দেখা যায়, বসানো টাইলস খুলে ফেলা হচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যদি কেউ বিষয়টি নজরে না আনতেন, তাহলে কি নিম্নমানের কাজই চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হতো?
 
এর আগেও একই প্রকল্পে সাদ ডালাইয়ের কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তখনও নানা সমালোচনার মুখে কিছু কাজ সংশোধন করা হয়। কিন্তু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরো প্রকল্পের তদারকি ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ।
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাতের আঁধারে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। কেন দিনের আলো এড়িয়ে রাতে কাজ করতে হবে এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। আরও অভিযোগ রয়েছে, টাইলস বসানোর কাজে প্রয়োজনীয় অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি, যা কাজের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
 
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কেন একই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে? অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি শুধু ত্রুটিপূর্ণ অংশ খুলে পুনরায় কাজ করাকেই সমাধান হিসেবে ধরা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো ঠিকাদারই মানসম্মত কাজ করার প্রয়োজন অনুভব করবে না। কারণ অভিযোগ ধরা পড়লে সামান্য সংশোধন, আর ধরা না পড়লে নিম্নমানের কাজ দিয়েই প্রকল্প শেষ এমন সংস্কৃতি সরকারি উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
 
এদিকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে কাজের এমন ভয়াবহ অনিয়ম ও নিম্নমানের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাসনিয়া এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি নান্টু মিয়া অভিযোগের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন,
কাজের তদারকির দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, আমার না।
 
ঠিকাদারের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে আরও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার কীভাবে নিজের কাজের গুণগত মান ও তদারকির দায় এড়িয়ে যেতে পারেন।
 
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য
এদিকে কাজের অনিয়মের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন,
“গত রাতেও অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমি কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আজও কাজ পরিদর্শন করে পুনরায় সঠিক ও নিয়মমাফিকভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য কঠোর পরামর্শ দিয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও অবহিত করা হয়েছে।
 
বিষয়টি নিয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন,
“অভিযোগ পাওয়ার পর আমি নিজেই সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। কাজের মান বজায় রাখতে এবং সঠিক নিয়মে যেন কাজ সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
 
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী স্বাস্থ্য প্রকৌশলী সুব্রত দেবনাথ বলেন,
“অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা সরেজমিনে তদন্ত করি এবং গিয়ে দেখতে পাই দেয়ালে লাগানো টাইলসগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
 
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু নির্দেশনা নয়, অভিযোগের সত্যতা বারবার প্রমাণিত হওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।
 
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে যদি বারবার অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং প্রতিবারই অভিযোগের সত্যতা মেলে, তাহলে বিষয়টিকে আর সাধারণ ভুল বা অসাবধানতা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, কাজের মান এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
 
এখন কমলগঞ্জবাসীর প্রশ্ন একই প্রকল্পে বারবার অনিয়মের অভিযোগ কেন? অভিযোগের সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? কতবার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে? আর কতবার জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রকল্পে অনিয়ম ধরা পড়ার পর শুধু “সংশোধনের নাটক” দেখানো হবে?
 
হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন দায়সারা কাজ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কমলগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ। তাদের প্রত্যাশা, প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 
এ সংস্করণে অভিযোগ, প্রশাসনের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সবকিছুই ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ফলে এটি প্রকাশযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদনের কাঠামোর সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ।