চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত লক্ষাধিক চা শ্রমিক ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালুর দাবিতে কমলগঞ্জে মানববন্ধন
রাজন আবেদীন রাজু, স্টাফ রিপোর্টার:
চা শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতেই হবে এই স্লোগানকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বন্ধ থাকা ক্যামেলিয়া হাসপাতাল পুনরায় চালুর দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) সকাল ৯টায় উপজেলার আলীনগর চা বাগানের ফ্যাক্টরি গেটে এ কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিক, ছাত্র ও যুবসমাজ।
শমশেরনগর, কানিহাটি, বাঘীছড়া, দেওছড়া ও ডাবলছড়া চা বাগানের বাগান পঞ্চায়েতের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক অংশ নেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানে তারা দ্রুত হাসপাতালটি চালুর দাবি জানান।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েতের সভাপতি গনেশ পাত্র। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি, সাবেক ইউপি সদস্য ও শ্রমিক নেতা সীতারাম বিন, শিক্ষক ও শ্রমিক নেতা নির্মল দাস পাইনকা, শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াকুব মিয়া, ইউপি সদস্য কিরণ কুমার বৈদ্য, রামবিরিচ কৈরি, গৌরি রানী কৈরী, কামারছড়া চা বাগানের সভাপতি দিলিপ কৈরী এবং যুবনেতা সজল কৈরি।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দেওছড়া চা বাগানের সভাপতি শংকর রবিদাস, কানিহাটি চা বাগানের সভাপতি প্রতাপ রিকিয়াসন, বাঘীছড়া চা বাগানের সভাপতি লচমী রবিদাস এবং ভাবলছড়া চা বাগানের সভাপতি সঞ্জু তাঁতিসহ বিভিন্ন বাগানের শ্রমিক নেতারা।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত ২৬ মার্চ রাতে শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিক বাবুল রবিদাসের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে ঐশী রবিদাস অসুস্থ হয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরদিন সকালে তার মৃত্যু হলে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ওই ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেয়।
ফলে কমলগঞ্জ ও আশপাশের ৩৫টি চা বাগানের প্রায় এক লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার বর্তমানে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। জরুরি চিকিৎসা, মাতৃসেবা, শিশু চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনাজনিত সেবাসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, অধিকাংশ চা শ্রমিকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে সাধারণ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসূতি মায়েদের জটিলতা পর্যন্ত নানা স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে শ্রমিক পরিবারগুলোকে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন,
চা শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও অনিশ্চিত। দ্রুত হাসপাতাল চালু না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
শ্রমিক নেতা সীতারাম বিন, নির্মল দাস পাইনকা ও ইউপি সদস্য ইয়াকুব মিয়া বলেন,
একটি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার। এটি বন্ধ থাকা মানে পুরো শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন,
“হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট রয়েছে। অধিকাংশ বাগানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে নারী শ্রমিক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা এখনও অত্যন্ত সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রপ্তানি আয় ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া সত্ত্বেও চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। তাই ক্যামেলিয়া হাসপাতাল পুনরায় চালু করা শুধু একটি হাসপাতাল খোলার বিষয় নয়, বরং হাজারো শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি।








